বাগেরহাটের চিতলমারীর কৃতি সন্তান, একাধারে সরকারি কর্মকর্তা ও সাহিত্যসেবী এস, এম শওকত আলী-র বর্ণাঢ্য জীবন ছিল কর্ম ও সৃজনশীলতার এক অপূর্ব সমন্বয়। ১৯৩১ সালে খুলনা জেলার (বর্তমান বাগেরহাট) চিতলমারী ইউনিয়নের আড়ুয়াবর্নি গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এই গুনীজন দীর্ঘ ৩৮ বছর সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
এস, এম শওকত আলীর বিদ্যাশিক্ষার হাতেখড়ি হয় গ্রাম্য পাঠশালায়। তিনি শৈশবকাল থেকেই পড়ালেখায় অত্যন্ত মনোযোগী ও পটু ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি চিতলমারী 'এস. এম. এইচ (শামসুন্নাহার মেমোরিয়াল) হাই স্কুল' থেকে সফলভাবে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তার যৌবনের প্রারম্ভ থেকেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন, যা তার কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও অব্যাহত ছিল।
১৯৫৬ সালে খুলনা চাকরি বিনিয়োগ কেন্দ্রের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব তালিকা প্রস্তুতকল্পে (বাকেরগঞ্জ-খুলনা-যশোর) অস্থায়ীভাবে ঝিকরগাছা, যশোরে তার প্রথম কর্মজীবন শুরু হয়। একই বছর ২৮শে অক্টোবর তিনি চাচড়া রাজবাড়ী অস্থায়ী সার্ভে ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে আমিনশীপ পাশ করেন এবং ৩রা নভেম্বর অভয়নগর থানা ক্যাম্পে আমিন হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালের ১০ই আগস্ট তিনি লিয়াজো আমিন হিসেবে যশোর সদর থানা রাজস্ব তহশিল অফিসে বদলি হন। যশোরে কর্মরত থাকাকালীন তিনি 'বিদ্রোহী কবির মত' শিরোনামে কবিতা রচনা করেন। এরপর তিনি কচুয়া থানায়ও একই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে অস্থায়ী চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি চাকরির সন্ধানে খুলনা চলে আসেন।
চাকরি থেকে সাময়িক অবসর গ্রহণের পর ১৯৫৮ সালে তিনি লেখালিখির প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং একাধারে বেশ কয়েকটি কবিতা রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছেঃ
পথের যাত্রী
আজান
বিশ্ব নবী (সঃ)
হযরত আদম (আঃ)
অভিমান
মা
জীবন সাধনা
মৃত্যু পথ যাত্রী
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের প্রতি
মোনাজাত
তবে তার কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৫৮ সালে, যখন তিনি পুনরায় খুলনা জেলা প্রশাসনের ভূমি হুকুম দখল শাখায় সার্ভেয়ার হিসাবে নিযুক্ত হন। এস, এম শওকত আলীর কর্মজীবনের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ১৯৬১ সালে সরকারি দায়িত্ব নিয়ে ভারতে গমন। তৎকালীন পাকিস্তানের একটি নৌযান, 'এম. এল. গ্লোরী অফ ঢাকা', আর্মস এ্যামুনেশন ফোর্সসহ চর দখল সংক্রান্ত বিবাদে ভারত কর্তৃক অধিগৃহীত হয়। মামলা তৎকালীন পাকিস্তানের পক্ষে গেলে সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে নেজারত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটসহ নৌযানটি ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে তাকে ভারতে যেতে হয়। দীর্ঘ একমাস তিনি ভারতে অবস্থান করেন এবং চব্বিশ পরগনার বশিরহাট হতে অক্ষত অবস্থায় নৌযানটি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। ভারতে থাকাকালীন তিনি তার অভিজ্ঞতা নিয়ে 'আমার দেখা কলিকাতা' শিরোনামে একটি আখ্যানমূলক প্রবন্ধ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গল্পগুচ্ছ হলোঃ
আত্ম পরিচয়ের সন্ধানে
ঢাকা ও ময়মনসিংহের পথে-পথে
স্মরণে আলাউদ্দিন আহম্মেদ
নির্বুদ্ধিতার পরিণাম (রম্য রচনা)
শবেবরাত
রিক্তের বেদন
দীর্ঘ ৩৮ বছর সেটেলমেন্ট অফিস ও জেলা প্রশাসনের অধীনে কাজ করে তিনি ১৯৯৪ সালের ২৮শে জুলাই এল. এ শাখা হতে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর সাহিত্যচর্চার প্রতি তিনি পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন। তার কবিতায় ফুটে উঠেছে জীবনের নানা দিক ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। তার অন্যান্য কবিতার মধ্যে রয়েছে: মোয়াজ্জেম স্মরণে, যারা চলে গেছে, যৌবন কিশোর, প্রার্থনা, বিরহ বিচ্ছেদ, নজরুল জয়ন্তী, প্রতিবেশী, নসীবের দুঃখ, সবুর মিঞা, চাঁত্রার বিলে, অপরূপ ছবি, ধৈর্য ধর, বন্যা ও সবুজ পরশে জীবন।
কর্ম ও সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখা এই গুনীজন ২০০৭ সালের ৯ই অক্টোবর খুলনা শহরের ১২৪ পশ্চিম টুটপাড়া মেইন রোডের নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। তার জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।