শীতের আগমনী বার্তায় হিমেল হাওয়ার পরশ এখন খুলনার অলিগলিতে। ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে যান্ত্রিক নগরের ব্যস্ত জীবনে একটুখানি উষ্ণতা আর তৃপ্তির খোঁজে ভোজনরসিকরা ভিড় জমাচ্ছেন রাস্তার ধারের পিঠার দোকানগুলোতে। বিশেষ করে খুলনার শান্তিধাম মোড় সংলগ্ন জাতিসংঘ পার্কের পশ্চিম পাশে এখন রীতিমতো উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের আলো ম্লান হতেই সেখানে বসছে হরেক রকমের পিঠার পসরা। ভ্যানে বা ছোট অস্থায়ী দোকানে সাজানো এই পিঠাগুলোর ঘ্রাণে ম ম করছে চারপাশ। আতপ চালের গুঁড়া আর নতুন খেজুরের গুড়ের সেই চিরচেনা সুবাস পথচারীদের থমকে যেতে বাধ্য করছে। ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিক্রেতাদের, তবুও হাসিমুখে তারা পরিবেশন করছেন গরম গরম শীতের ঐতিহ্যবাহী সব পিঠা।
এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো মাটির চুলার ধোঁয়া ওঠা সাদা চিতই পিঠা। সাধারণ এই পিঠাটি যখন ঝাল ঝাল সরিষা বাটা, ধনেপাতা কিংবা শুঁটকি ভর্তার সাথে পরিবেশন করা হয়, তখন তার স্বাদ যেন অমৃতকেও হার মানায়। অনেক ভোজনরসিক আবার নস্টালজিয়ায় ডুবে যেতে এই চিতই পিঠা খেজুরের রসে ভিজিয়ে খাওয়ার আনন্দও নিচ্ছেন। চিতইয়ের পাশাপাশি মিষ্টিপ্রেমীদের জন্য রয়েছে রাজকীয় স্বাদের পাটিসাপটা। বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই পাটিসাপটাগুলো তৈরিতে তারা সাধারণ ক্ষীরের পাশাপাশি ঘি এবং বিশেষ সন্দেশ ব্যবহার করেন। নরম তুলতুলে এই পিঠার ভেতরে থাকা সেই বিশেষ পুরের স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো। যারা একটু বেশি মিষ্টি পছন্দ করেন, তাদের ভিড় মূলত এই পাটিসাপটার দোকানগুলোতেই বেশি দেখা যায়।
তবে শীতের সন্ধ্যার পূর্ণতা আসে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাপা পিঠায়। চুলা থেকে মাত্রই নামানো ভাপা পিঠার ভেতর যখন নতুন খেজুরের গুড় টইটম্বুর করে আর ওপরে সাদা ধবধবে ফ্রেশ নারিকেল কোরা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তার আবেদন উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। নলেন গুড়ের সেই ম ম ঘ্রাণ যান্ত্রিক শহরের মানুষকে এক নিমেষেই গ্রামবাংলার শেকড়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এখানে পিঠা বিক্রি করেন মাসুদ, শহীদুল বা নুরুল আমিনের মতো অনেকেই। এদের কেউ কেউ বংশপরম্পরায় এই ব্যবসার হাল ধরে রেখেছেন, আবার অনেকে সারাদিন অন্য পেশায় নিয়োজিত থাকলেও শীতের সন্ধ্যায় একটু বাড়তি আয়ের আশায় এই পসরা সাজিয়ে বসেন। প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলে তাদের এই ব্যস্ততা।
এই পিঠার দোকানগুলো কেবল একটি বাণিজ্যিক স্থান নয়, বরং নাগরিক জীবনে ঐতিহ্যের সাথে সংযোগ স্থাপনের একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। যান্ত্রিক এই শহরেও পিঠাপুলির এই সংস্কৃতি আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। পরিবারের প্রিয়জন কিংবা বন্ধুদের নিয়ে শীতের এই আমেজ উপভোগ করার জন্য শান্তিধাম মোড়ের এই এলাকাটি এখন খুলনার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় এক টুকরো গরম পিঠা আর প্রিয় মানুষের সঙ্গ—এই দুই মিলে শীত যেন পূর্ণতা পাচ্ছে এই জনপদে। যারা খুলনার আশেপাশে আছেন, তারা এই পিঠাময় সন্ধ্যার স্বাদ নিতে সপরিবারে ঘুরে আসতে পারেন জাতিসংঘ পার্কের এই পিঠা পল্লী থেকে।