বাংলার লোক-ঐতিহ্য আর আধ্যাত্মিক সাধনার আকাশে যে নামটি ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল, তিনি বাউল সম্রাট লালন শাহ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত এই মহাপুরুষ কেবল একজন চারণ কবি বা গায়ক ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একাধারে মানবতাবাদী সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার অগ্রদূত। ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নেওয়া এই সাধকের জীবন ছিল যেমন রহস্যময়, তেমনি তাঁর দর্শন ছিল সুগভীর। যদিও তাঁর জন্মস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে, তবে জনশ্রুতি অনুযায়ী তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডুর হারিশপুর গ্রামে তিনি ভূমিষ্ঠ হন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো না থাকলেও স্বশিক্ষিত এই গুণী মানুষটি তাঁর প্রখর জীবনবোধ আর শিল্পচেতনা দিয়ে বাংলা লোকসংগীতকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
লালনের জীবনধারা ও চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল তাঁর তরুণ বয়সের এক আকস্মিক ঘটনা। প্রচলিত আছে, হিন্দু কায়স্থ পরিবারে জন্ম নেওয়া লালন তীর্থভ্রমণে বের হয়ে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে সঙ্গীরা তাঁকে মৃত ভেবে পথে ফেলে চলে যান। সেই ঘোর বিপদে সিরাজ সাঁই নামক এক মুসলিম সাধক তাঁকে আশ্রয় দিয়ে পরম মমতায় সুস্থ করে তোলেন। সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যেই লালন আধ্যাত্মিক জগতের সন্ধান পান এবং তাঁকে নিজের গুরু হিসেবে বরণ করে নেন। এই জীবনসংগ্রামই সম্ভবত লালনের মনে ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার জয়গান গাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল। তাঁর গানে বারবার ধ্বনিত হয়েছে জাত-পাত আর সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের মোল্লা-পুরোহিতদের কুসংস্কার আর সামাজিক অনুশাসনের বেড়াজাল ছিঁড়ে তিনি প্রচার করেছেন সত্য, শান্তি আর সাম্যের বাণী।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, মহাত্মা গান্ধীরও প্রায় ২৫ বছর আগে এই উপমহাদেশে লালন শাহকেই সর্বপ্রথম ‘মহাত্মা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। তাঁর গানের গভীরতা আর দার্শনিক তত্ত্বে মুগ্ধ হয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের প্রায় আড়াই হাজার গান সংগ্রহ ও প্রকাশ করে তাঁর দর্শনকে শিক্ষিত সমাজের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। লালনের গান কেবল বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা আজ বিশ্ব নাগরিকের সম্পদ এবং মানবতার এক কালজয়ী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাঁর অলংকারমণ্ডিত কাব্যভাষা ও সুরের মূর্ছনা আজও মানুষকে আত্মিক প্রশান্তি আর জীবনের মানে খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
দীর্ঘ ১১৬ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকাংশ সময় লালন সাঁই কাটিয়েছেন কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায়। সেখানে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র বা আখড়া। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ অক্টোবর এই মরমী সাধক নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও তাঁর রেখে যাওয়া হাজারো গানের সুর আজও মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হয়। আজও ছেঁউড়িয়ার সেই আখড়া দেশ-বিদেশের অগণিত বাউল ভক্ত আর গবেষকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। লালনের দর্শন আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মনুষ্যত্বই হলো পরম ধর্ম। বর্তমানে হানাহানি আর অস্থিরতার বিশ্বে লালনের অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিবাদী আদর্শ এক মহৌষধ হিসেবে কাজ করতে পারে।