প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী বাঘ ও গরু শিকারি এবং শিকারের চিরশত্রু হিসেবেই পরিচিত। তবে এই প্রচলিত সংজ্ঞাকে আমূল বদলে দিয়েছে ভারতের আসামের একটি নিভৃত গ্রামে ঘটে যাওয়া এক অলৌকিক ঘটনা। প্রতিদিন গভীর রাতে গ্রামের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন কুকুরের আর্তচিৎকার ভেসে আসত, তখন স্থানীয়রা চোরের ভয়ে তটস্থ থাকতেন। কিন্তু আসল সত্যটি যে কোনো রহস্য রোমাঞ্চ গল্পের চেয়েও শিহরণ জাগানিয়া হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। একটি গরুর ওপর চোর বা বন্য প্রাণীর আক্রমণের আশঙ্কা থেকে এক গ্রামবাসী সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেন। পরদিন ফুটেজ পরীক্ষা করতে গিয়ে সকলের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। দেখা যায়, রাতের আঁধারে কোনো তস্কর নয়, বরং একটি পূর্ণবয়স্ক বিশাল চিতাবাঘ পরম মমতায় গরুটির পাশে এসে বসছে এবং অদ্ভুত এক মিতালিতে মেতে উঠছে।
এই অবিশ্বাস্য সম্পর্কের নেপথ্যে থাকা রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে এক বিরল ও করুণ ইতিহাস। অনুসন্ধানে জানা যায়, আজ থেকে বেশ কিছুদিন আগে যখন এই চিতাবাঘটি মাত্র ২০ দিনের এক অসহায় শাবক ছিল, তখন এক দুর্ঘটনায় সে তার গর্ভধারিণী মাকে হারায়। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সেই অনাথ শাবকটিকে আশ্রয় ও জীবনদান করেছিল এই গরুটি। নিজ সন্তানের মতোই দুধ পান করিয়ে মাতৃত্বের ছায়ায় বাঘের বাচ্চাটিকে বড় করে তোলে এই মায়াবী প্রাণীটি। সময়ের পরিক্রমায় সেই শাবকটি আজ বিশাল এক হিংস্র চিতাবাঘে পরিণত হয়ে বনে ফিরে গেলেও, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সেই ‘দুধমা’র অবদান সে এক মুহূর্তের জন্যও বিস্মৃত হয়নি।
প্রতি রাতে বনের গহিন থেকে লোকালয়ে ফিরে আসা এই চিতাটি গরুটির শরীরে গা ঘেঁষে বসে থাকে এবং অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে মাথা ঠেকিয়ে যেন তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। অবাক করার বিষয় হলো, সাধারণ অবস্থায় বাঘের গন্ধে গবাদি পশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও, গরুটি অত্যন্ত নিশ্চিন্তে এই হিংস্র প্রাণীকে আদর করে দেয়। প্রকৃতির এই অদ্ভুত দৃশ্য একদিকে যেমন প্রাণিজগতের গভীর অনুভূতির প্রমাণ দেয়, অন্যদিকে মানুষের বিবেককেও যেন এক কঠিন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। আধুনিক পৃথিবীতে যখন তথাকথিত শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ তুচ্ছ স্বার্থে একে অপরকে আঘাত করতে দ্বিধা করে না, কিংবা সত্যকে গোপন করে মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তখন বনের পশুরা হিংস্রতা ভুলে কৃতজ্ঞতার যে অসামান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা আমাদের জন্য এক বিরাট শিক্ষা। পশুর অন্তরে থাকা এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত এটিই প্রমাণ করে যে, ভালোবাসার কাছে সমস্ত হিংস্রতা ও শিকারের নেশা তুচ্ছ হতে বাধ্য।