ঐতিহ্যবাহী জেলা বাগেরহাটে চিরচেনা লোকজ আমেজ আর বর্ণিল অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে বাগেরহাট জেলা স্টেডিয়ামে জাতীয় সংগীত এবং বর্ষবরণের চিরায়ত গান ‘এসো হে বৈশাখ’-এর সুরেলা মূর্ছনায় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আয়োজিত এই উৎসবে জেলার সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। সংগীতের আসর শেষে স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ থেকে এক বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়, যা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম মাঠে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে শান্তির প্রতীক পায়রা ও রঙিন বেলুন উড়িয়ে উৎসবের দ্বিতীয় পর্বের উদ্বোধন করা হয়, যা বাগেরহাটের আকাশ-বাতাসকে উৎসবের রঙে রাঙিয়ে তোলে।
উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে জেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম মাঠে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী বিশাল বৈশাখী মেলা। বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। মেলা প্রাঙ্গণে সাজানো ২০টি ভিন্নধর্মী স্টলে গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী সব খাবার, হস্তশিল্প এবং সৌখিন পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে পান্তা-ইলিশের স্বাদ নিতে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বলেন, বাঙালির সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এ ধরনের মেলা ও সামাজিক মিলনমেলা অপরিহার্য।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আনন্দ আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ হাছান চৌধুরী ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন। এছাড়াও বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাইদ শুনুসহ জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই উৎসবে সংহতি প্রকাশ করেন। বক্তারা বলেন, নববর্ষের এই শক্তি যেন সাম্প্রদায়িকতা ও সকল অমঙ্গলকে বিনাশ করে একটি সুন্দর আগামী বিনির্মাণে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ও শহরজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যাতে সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
দিবসটির মাহাত্ম্য কেবল মেলা বা শোভাযাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং মানবিক কল্যাণেও নেওয়া হয়েছিল বিশেষ পদক্ষেপ। জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৃথকভাবে নববর্ষ উদযাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা কারাগার, আধুনিক সদর হাসপাতাল, সরকারি শিশু পরিবার এবং এতিমখানাগুলোতে পরিবেশন করা হয়েছে উন্নত মানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার। এছাড়া কারাবন্দি ও শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মেধা বিকাশের অংশ হিসেবে জেলা শিশু একাডেমি ও গণগ্রন্থাগারে শিশুদের চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতারও বিশেষ সূচি রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে বাগেরহাটে নববর্ষের এই উৎসবটি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিকতার এক অনন্য মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছে।