সুস্থ হাড় ও দাঁতের গঠনে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম হলেও রক্তে এর মাত্রারিক্ত উপস্থিতি শরীরের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় রক্তে ক্যালসিয়ামের এই আধিক্যকে বলা হয় ‘হাইপার ক্যালসেমিয়া’। শরীরে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য বজায় না থাকলে তা কেবল হাড় নয়, বরং কিডনি, হৃদযন্ত্র এবং মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে অকার্যকর করে দিতে পারে। এই সমস্যাটি মূলত একটি ‘মেডিকেল ইমার্জেন্সি’ বা জরুরি স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচিত, যার সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে একাধিক অঙ্গ একসাথে বিকল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
হাইপার ক্যালসেমিয়া হলে সবচেয়ে বড় ধকল যায় কিডনির ওপর। রক্তে ক্যালসিয়াম বেড়ে গেলে প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বারবার তৃষ্ণা অনুভূত হয়। এর ফলে কিডনিতে বারবার পাথর হওয়া কিংবা পিত্তথলিতে পাথর জমার মতো যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কিডনিতে ক্যালসিয়ামের দানা জমে নেফ্রোক্যালসিনোসিস হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত কিডনি বিকল বা ফেইলিউরের দিকে ঠেলে দেয়। কেবল কিডনিই নয়, অতিরিক্ত ক্যালসিয়ামের প্রভাব পড়ে পরিপাকতন্ত্রের ওপরও। এর ফলে পেটে ব্যথা, বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা, কোষ্ঠকাঠিন্য এমনকি প্যানক্রিয়াসের প্রদাহ ও পেপটিক আলসারের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
শরীরের অধিকাংশ ক্যালসিয়াম হাড় থেকে রক্তে চলে আসার কারণে হাড়গুলো ভেতর থেকে দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এতে হাড় ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা, হাড়ের ভেতর সিস্ট তৈরি হওয়া এবং সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়; যার ফলে স্মৃতিভ্রম, বিষণ্নতা, মনোযোগের অভাব এবং অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। এছাড়া হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া ও হৃৎস্পন্দন এলোমেলো হয়ে যাওয়া কিংবা হঠাৎ বুক ধড়ফড় করাও রক্তে ক্যালসিয়াম বেড়ে যাওয়ার অন্যতম লক্ষণ।
এই শারীরিক সংকটের পেছনে বেশ কিছু কারণ দায়ী থাকতে পারে। সাধারণত প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থিতে টিউমার বা এই হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ক্যানসার, ভিটামিন-ডি বা এ-এর আধিক্য, থাইরয়েড হরমোনের অসামঞ্জস্যতা এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও এমনটি হতে পারে। তাই এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আধুনিক চিকিৎসায় দ্রুত ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমিয়ে আনার পাশাপাশি মূল কারণ চিহ্নিত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যা রোগীকে বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম।