সম্প্রতি দেশের উচ্চশিক্ষা ও চিকিৎসা বিজ্ঞান অঙ্গনে নেমে এসেছে এক বিষাদময় স্তব্ধতা। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির (সিভাসু) মেধাবী শিক্ষক অধ্যাপক ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির আকস্মিক ও অকাল প্রস্থান আমাদের এক কঠিন, নির্মম এবং বিরল স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মশাবাহিত অত্যন্ত বিপজ্জনক রোগ ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’-এ আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর মস্তিষ্কে মারাত্মক রক্তক্ষরণ বা মাল্টিপল হেমোরেজিক স্ট্রোক হয়, যা এই রোগের ভয়াবহতা ও বিস্তৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, জাপানিজ এনসেফালাইটিস হলো মূলত ‘ফ্লাভিভাইরাস’ গোত্রের একটি অত্যন্ত মারাত্মক ভাইরাস সংক্রমণ, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে কোনো রকম পূর্বসতর্কতা ছাড়াই সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং মগজ বা মস্তিষ্ককে আক্রমণ করে। সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, অত্যন্ত ভীতিপ্রদ এই রোগটি কি আমাদের বাংলাদেশেও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে কি না। এর উত্তর নিশ্চিতভাবে ইতিবাচক, কারণ ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণে বাংলাদেশ এই ভাইরাসের জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। বিশেষ করে দেশের উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকা, যেখানে বিস্তীর্ণ ধানখেত, ডোবা এবং উন্মুক্ত জলাশয়ের আধিক্য রয়েছে, সেখানে এই ভাইরাসের বিস্তার ও প্রকোপ মাঝেমধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক ও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে এই ভাইরাসের উপস্থিতি একেবারেই নতুন নয়। আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে ১৯৭৭ সালে দেশের ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রথমবারের মতো এই রোগটি সরকারিভাবে শনাক্ত করা হয়েছিল। ওই সময় ব্যাপক আকারে মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও তৎকালীন চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে ঠিক কতজন আক্রান্ত হয়েছিলেন বা কতজনের প্রাণহানি ঘটেছিল, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান মেলেনি। পরবর্তীতে ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের চারটি বিশেষায়িত হাসপাতালে পরিচালিত এক নিবিড় গবেষণায় ৪৯২ জন জটিল এনসেফালাইটিস রোগীর মধ্যে ২০ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে জাপানিজ এনসেফালাইটিসের উপস্থিতি ধরা পড়ে এবং তাদের মধ্যে দুই জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশের বড় বড় হাসপাতালভিত্তিক এক দীর্ঘমেয়াদি নজরদারিতে দেখা যায়, ৬ হাজার ৫২৫ জন মেনিনজাইটিস ও এনসেফালাইটিস রোগীর মধ্যে ৫৪৮ জনই ছিলেন জাপানিজ এনসেফালাইটিসের শিকার। অতি সম্প্রতি ২০২৬ সালের বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘ল্যানসেট ইনফেকশাস ডিজিজেস’-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৫৭ thousand বা ১ লাখ ৫৭ হাজার মানুষ এই ভাইরাসের সংস্পর্শে এলেও, গড়ে আনুমানিক ১৫৭টি ক্লিনিক্যাল কেস বা দৃশ্যমান জটিলতা জনসমক্ষে ধরা পড়ে এবং প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩১ জন রোগী এই ভাইরাসের কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এই রোগের মূল বাহক বা খলনায়ক হলো আমাদের চিরচেনা কিউলেক্স মশা। এই ভাইরাসের মূল উৎস বা আধার হিসেবে কাজ করে গৃহপালিত শুকর এবং বকের মতো বিভিন্ন জলজ পাখি। কিউলেক্স মশা যখন এই আক্রান্ত প্রাণীগুলোকে কামড়ানোর পর কোনো সুস্থ মানুষকে কামড়ায়, তখন তাদের লালার মাধ্যমে ভাইরাসটি মানুষের রক্তস্রোতে প্রবেশ করে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এটি ডেঙ্গু বা করোনার মতো মানুষ থেকে মানুষে সরাসরি ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রাথমিক অবস্থায় কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ প্রকাশ পায় না, কিংবা সাধারণ বা মৃদু জ্বরের মতো মনে হতে পারে। তবে প্রতি ২৫০ জন আক্রান্তের মধ্যে অন্তত ১ জনের ক্ষেত্রে এই রোগটি অত্যন্ত উগ্র ও মারাত্মক রূপ ধারণ করে। এর প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ করে ১০০ ডিগ্রির ওপরে তীব্র ও উচ্চমাত্রার জ্বর আসা, অসহ্য মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, অনবরত বমি বমি ভাব, কথা জড়িয়ে যাওয়া এবং চরম মানসিক বিভ্রান্তি বা অসংলগ্ন আচরণ করা। রোগটি আরও মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছালে রোগীর শরীরে তীব্র খিঁচুনি শুরু হয় এবং একপর্যায়ে রোগী পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে কোমার মতো অচেতন অবস্থায় চলে যান। এমন স্নায়বিক লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই রোগীকে কোনো রকম বিলম্ব না করে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ নিউরোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে বিশেষায়িত হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্ট সুবিধাসহ ভর্তি করা জরুরি, কারণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই রোগে আক্রান্ত হওয়া আশঙ্কাজনক রোগীদের প্রতি ৪ জনের মধ্যে ১ জনই মৃত্যুবরণ করেন।
এই রোগে আক্রান্তদের স্ট্রোক এবং মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জাপানিজ এনসেফালাইটিস ভাইরাসটি সরাসরি মস্তিষ্কের কোষে মারাত্মক প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি করে। এই তীব্র প্রদাহের ফলে মাথার খুলির ভেতরে তরল ও কোষের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত চাপের কারণে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে থাকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল রক্তনালিগুলো হঠাৎ করে ছিঁড়ে যায়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘হেমোরেজিক স্ট্রোক’ বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ নামে পরিচিত। মূলত মস্তিষ্কের অতি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলেই রোগীর জীবনপ্রদীপ দ্রুত নিভে যায়। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখনও এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো সুনির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ বা শতভাগ কার্যকরী চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে ‘প্রতিরোধই একমাত্র পথ ও প্রধান অস্ত্র’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় ও কার্যকর উপায় হলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সরকারি উদ্যোগে গণ-টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভ্যাকসিন বা টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি কিউলেক্স মশার বংশবৃদ্ধি রোধে বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমতে না দেওয়া, জঙ্গল পরিষ্কার রাখা এবং মশার কামড় থেকে বাঁচতে সার্বক্ষণিক মশারি বা মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিরল হলেও এই রোগের পরিণতি যেহেতু অত্যন্ত নির্মম ও সুদূরপ্রসারী, তাই সামান্য জ্বর বা স্নায়বিক কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেই অবহেলা না করে অনতিবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য সর্বস্তরের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।