আগামী পবিত্র ঈদুল আজহা উৎসবকে কেন্দ্র করে খুলনা মহানগরী ও জেলা জুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযথ মর্যাদা বজায় রেখে এই উৎসব উদযাপনের লক্ষ্যে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে নানামুখী সরকারি কর্মসূচি ও কঠোর নিরাপত্তামূলক নির্দেশনা জারি করেছে। এবারের ঈদুল আজহার প্রধান ও বৃহৎ জামাতটি সকাল ৭টায় খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে নারীদের জন্য পর্দা সহকারে নামাজ আদায়ের পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে ঈদের দিন সকালের আবহাওয়া কোনো কারণে প্রতিকূল থাকলে বা বৃষ্টিপাত হলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে খুলনা টাউন জামে মসজিদে পর্যায়ক্রমে তিনটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে, যার প্রথমটি সকাল ৭টায়, দ্বিতীয়টি সকাল ৮টায় এবং সর্বশেষ জামাতটি সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া সকাল সাড়ে ৭টায় খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন মডেল মসজিদেও ঈদের বড় জামাত আয়োজনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় ও প্রতিটি ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নগরীর সবকটি ওয়ার্ডেও পৃথক পৃথক জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান জামাতগুলোর সময় সার্কিট হাউজের পাশে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন আউটার স্টেডিয়ামটি উন্মুক্ত ও সংরক্ষিত রাখা হবে এবং মুসল্লিদের অজু করার জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
ঈদের উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে জাতীয় পতাকার সঠিক রঙ ও মাপ বজায় রেখে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে উত্তোলনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে শহরের সৌন্দর্য বাড়াতে প্রধান সড়ক, সড়কদ্বীপ, সার্কিট হাউস ময়দান ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো ‘ঈদ মোবারক’ খচিত বাংলা ও আরবি ব্যানার এবং জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হবে। পবিত্র এই আনন্দের দিনে মানবিক দিকটি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল, জেলা কারাগার, শিশুসদন, ছোটমনি নিবাস, ভবঘুরে আশ্রয় কেন্দ্র ও দুস্থ কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে উন্নতমানের বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হবে। এর পাশাপাশি ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বিশেষ সেমিনার ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। তবে শহরের সৌন্দর্যহানি ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে এবার রাস্তায় যত্রতত্র স্বাগত তোরণ বা গেট নির্মাণ এবং বড় প্যানা-ব্যানার টাঙানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বিনোদনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বেতারের খুলনা কেন্দ্র থেকে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করা হবে এবং খুলনার স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো নিজস্ব উদ্যোগে দৃষ্টিনন্দন ঈদ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবে।
কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় এবার বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে যে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমতি ছাড়া খুলনা মহানগর ও জেলার কোথাও নতুন বা অননুমোদিত পশুর হাট স্থাপন করা যাবে না। বিশেষ করে কোনো লঞ্চ টার্মিনাল, ব্যস্ত মহাসড়ক, গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার পাশে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকায় গরুর হাট বসানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে ট্রাকে করে পশু নিয়ে আসার সময় যাতে ব্যবসায়ীরা মহাসড়কে কোনো ধরনের দুষ্কৃতকারী বা চাঁদাবাজের শিকার না হন এবং নির্ধারিত টোলের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় না করা হয়, সে লক্ষ্যে পুলিশ কড়া নজরদারি রাখবে। চামড়ার বাজারকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো ধরনের গুজব বা অপপ্রচার রোধে সাইবার টিম সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকবে, যাতে এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হয়। এছাড়া ঈদের দিন পশু জবাইয়ের পর পরিবেশ দূষণ ও জলাবদ্ধতা এড়াতে নির্ধারিত স্থানে কোরবানি সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে এবং জবাইয়ের পরপরই পর্যাপ্ত পানি ও ব্লিচিং পাউডার দিয়ে রক্ত ও বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করার জন্য নগরবাসীকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পবিত্র ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলবে। ঈদের আনন্দ উদযাপনের নামে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, আতশবাজি বা পটকা ফোটানো, রাস্তা বন্ধ করে মেলা বা স্টল তৈরি, উচ্চ শব্দে মাইক বা ড্রাম বাজানো এবং সড়ক-নৌপথে ট্রাকে বা পিকআপে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নৌপথে যেকোনো ধরনের ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং যাত্রী হয়রানি বন্ধে পুলিশি টহল জোরদার থাকবে। আগামী ২৭ মে থেকে ৬ জুন পর্যন্ত নৌপথে সব ধরনের বালুবাহী বাল্কহেড ও মালবাহী নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে এবং রাতের বেলায় স্পিডবোট চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উৎসবের সুযোগ নিয়ে রেলস্টেশন, বাস ও নৌযান টার্মিনালগুলোতে মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি ও পকেটমারদের তৎপরতা রুখতে এবং জাল টাকার বিস্তার রোধে সাদা পোশাকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকবে। এর পাশাপাশি লঞ্চ ও বাস টার্মিনালসহ দৌলতপুর খেয়াঘাট, জেলখানা ঘাট ও রূপসা ঘাটে অতিরিক্ত টোল বা ভাড়া আদায় এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন ঠেকাতে সার্বক্ষণিক মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং বিশেষ ভিজিলেন্স টিম দায়িত্ব পালন করবে। ছুটি চলাকালীন ব্যাংক, শপিং মল ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষ নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জেলার সার্বিক শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য বা অপ্রীতিকর ঘটনার আভাস পেলে তাৎক্ষণিকভাবে জেলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান কন্ট্রোল রুমের মোবাইল নম্বর ০১৭৭৭৭১০৬৯৯-এ যোগাযোগ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।