খুলনা মহানগরীতে অপরাধচক্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে শুরু হওয়া বিশেষ যৌথ অভিযানে এবার কেঁপে উঠেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের শক্ত ঘাঁটি। মহানগরের কুখ্যাত ও তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী বাবু ওরফে ‘গ্রেনেড বাবুর’ বাড়িতে আজ শুক্রবার বিকেলে এক আকস্মিক ও চিরুনি অভিযান পরিচালনা করেছে যৌথ বাহিনী। বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলা এই রুদ্ধশ্বাস অভিযানে গ্রেনেড বাবুকে না পাওয়া গেলেও তার ভাই মাহামুদুন চৌধুরী জনিকে আটক করতে সক্ষম হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
খুলনা মহানগরী থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মাদকের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার বিকেলে যৌথ বাহিনীর একটি শক্তিশালী দল গ্রেনেড বাবুর ডেরা ঘেরাও করে তল্লাশি চালায়। খুলনা সদর থানা পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার প্রথম সারিতে থাকা এই গ্রেনেড বাবুর অবর্তমানে তার বাড়ি থেকে তার ভাই জনিকে হেফাজতে নেওয়া হয়। খুলনা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মন এই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, সন্ত্রাসী ও মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে চলমান কঠোর ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
পুলিশের অপরাধ নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’র ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা কথিত সন্ত্রাসী সংগঠন ‘বি কোম্পানি’ দীর্ঘদিন ধরে খুলনা মহানগরীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছিল। এই চক্রটির বিরুদ্ধে একাধিক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, মাদক চোরাচালানের বিশাল নেটওয়ার্ক, চাঁদাবাজি এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে কেবল ভাই গ্রেনেড ব্যবুই নয়, আটক হওয়া মাহামুদুন চৌধুরী জনির বিরুদ্ধেও রয়েছে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নানা অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। বড় ভাইয়ের সন্ত্রাসী পরিচয় ও প্রভাবকে পুঁজি করে জনি মোংলা বন্দর কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (সিঅ্যান্ডএফ) ভবন জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, তীব্র খামখেয়ালিপনা ও ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে জনি ওই নামী সংগঠনের সাধারণ সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও সম্প্রতি নিজেকে সেটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বসেন, যা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
নগরীতে অপরাধীদের দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই কঠোর অবস্থানের পরিধি কেবল গ্রেনেড বাবুর বাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। খুলনা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) রেজাউর রহমান জানান, এই নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে একযোগে হানা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে হরিণটানা থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইমন মোল্লা এবং সোনাডাঙ্গা থানার কুখ্যাত সন্ত্রাসী রনি শেখ ওরফে কাবাসহ আরও বেশ কয়েকজন অপরাধীকে খাঁচায় বন্দী করা হয়েছে। একই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেনেড বাবুর বাড়িতেও অভিযানটি সফল করা হয়।
পুলিশ প্রশাসন থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জনিসহ অভিযানে আটক হওয়া বাকি অপরাধীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলছে এবং বিস্তারিত তথ্য খুব শীঘ্রই আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গণমাধ্যমকে জানানো হবে। দীর্ঘদিন পর খুলনা শহরের বুকে এমন দাপুটে ও রাঘববোয়াল সন্ত্রাসীদের ডেরায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন সাঁড়াশি অভিযানে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দারা এই সাহসী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং নগরীর কোণায় কোণায় শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ যেন কোনো অবস্থাতেই থেমে না যায়, সেই জোরালো দাবি জানিয়েছেন।