বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অসাবধানতা কিংবা অন্য কোনো কারণে ইন্টারনেটে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি। আপনার মুঠোফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, ঘরের ঠিকানা, ব্যাংক হিসাবের নম্বর কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য যদি সার্চ ইঞ্জিনে চলে আসে, তবে যে কেউ চরম ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সাইবার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ থেকে ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় সার্চ জায়ান্ট গুগল তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাসরি ব্যক্তিগত তথ্য অপসারণের একটি দারুণ সুযোগ দিচ্ছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে গুগল সার্চের ফলাফল থেকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্যগুলো চিরতরে আড়াল করে ফেলতে পারবেন।
নিজের কোনো গোপন তথ্য ইন্টারনেটে উন্মুক্ত হয়ে আছে কি না তা জানার জন্য গুগল একটি বিশেষ ফিচার চালু রেখেছে। তথ্য অপসারণের চূড়ান্ত আবেদন করার আগে ব্যবহারকারীকে প্রথমেই নিশ্চিত হতে হবে যে তাঁর তথ্যগুলো সার্চে দেখা যাচ্ছে কি না। এজন্য গুগলের ‘রেজাল্টস অ্যাবাউট ইউ’ পেজে প্রবেশ করে নিজের গুগল অ্যাকাউন্টে সাইন ইন করতে হবে। এরপর ব্যবহারকারী তাঁর যেসব তথ্য যেমন ফোন নম্বর বা ই-মেইল পর্যবেক্ষণ করতে চান, সেগুলো সেখানে যুক্ত করে দেবেন। একই সঙ্গে সতর্কবার্তা পাওয়ার জন্য ই-মেইল কিংবা গুগল অ্যাপের পুশ নোটিফিকেশন পদ্ধতিটি সচল করতে হবে। এই প্রাথমিক তথ্যগুলো জমা দেওয়ার পর গুগল পুরো ইন্টারনেট স্ক্যান করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করবে, যা তৈরিতে প্রথমবার আনুমানিক ছয় ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। সেই প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে যে ঠিক কোন কোন ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য দৃশ্যমান রয়েছে। একই পেজ থেকে পরবর্তীতে নতুন কোনো তথ্য ফাঁস হলো কি না তা জানার পাশাপাশি আগের করা আবেদনের অগ্রগতিও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
গুগল সার্চে যদি এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়, তবে মোবাইল কিংবা ডেস্কটপ ব্রাউজার ব্যবহার করে অত্যন্ত সহজ পদ্ধতিতে তা সরানোর আবেদন করা যায়। সার্চের ফলাফলে কাঙ্ক্ষিত ওয়েবসাইটের পাশে থাকা তিনটি ডট সম্বলিত মেনুতে ক্লিক বা ট্যাপ করে ‘রিমুভ রেজাল্ট’ অপশনটি বেছে নিতে হবে। এরপর গুগল তথ্যটি সরানোর সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চাইলে সেখানে এক বা একাধিক উপযুক্ত কারণ নির্বাচন করে দিতে হবে। আপনার করা আবেদনটি গুগল পর্যালোচনা করে সেটি গ্রহণ করলে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে তা জানিয়ে দেবে। সাধারণ তথ্যের বাইরেও সরকারি আইডি নম্বর, ক্রেডিট কার্ডের বিবরণী, লগইন আইডি ও পাসওয়ার্ড, ডিজিটাল স্বাক্ষর, মেডিকেল রেকর্ড, আপত্তিকর ছবি কিংবা অনুমতি ছাড়া তৈরি করা কোনো কুৎসিত ডিপফেক কনটেন্ট সরানোর জন্য গুগলের রয়েছে ‘পারসোনাল কনটেন্ট রিমুভাল’ নামের একটি ডেডিকেটেড সহায়তা পেজ। সেখানে সমস্যার ধরন উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের লিংক ও প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি জমা দিয়ে দ্রুত প্রতিকার পাওয়া যায়।
তবে ব্যবহারকারীদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, গুগল সার্চ থেকে কোনো লিংক বা তথ্য সরিয়ে ফেলা মানেই কিন্তু মূল ওয়েবসাইট থেকে তা মুছে যাওয়া নয়। অর্থাৎ তথ্যটি গুগলে আর দেখা না গেলেও মূল ডেটাবেজে থেকে যায়। তাই স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রথমেই সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের অ্যাডমিন বা মালিকপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে তথ্যটি মুছে ফেলার অনুরোধ করা উচিত। অনেক সময় মূল ওয়েবসাইট থেকে তথ্য বা ছবি মুছে ফেলার পরও গুগলের ক্যাশ মেমোরির কারণে সার্চ ফলাফলে বা গুগল ইমেজেসে পুরোনো তথ্য বা ছবি রয়ে যায়। এই জটিলতা দূর করতে গুগলের ‘রিমুভ আউটডেটেড কনটেন্ট’ টুলটি ব্যবহার করতে হবে এবং সেখানে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের ঠিকানা বা ছবির লিংকটি কপি করে জমা দিতে হবে।
যাবতীয় তথ্য ও লিংকসহ অপসারণের আবেদনটি সফলভাবে জমা হওয়ার পর গুগলের পক্ষ থেকে ব্যবহারকারীকে একটি ভেরিফিকেশন ই-মেইল পাঠানো হবে। এরপর গুগলের একটি বিশেষজ্ঞ দল পুরো আবেদনটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যালোচনা করবে এবং প্রয়োজনে আবেদনকারীর কাছ থেকে আরও কিছু অতিরিক্ত তথ্য বা প্রমাণ চাইতে পারে। সবশেষে আবেদনটি অনুমোদিত হয়েছে কি না তা চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়। তবে আবেদন করলেই যে সেটি নিশ্চিতভাবে মুছে ফেলা হবে এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। গুগল স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা যেকোনো তথ্য সরানোর ক্ষেত্রে একদিকে যেমন আবেদনকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে শ্রদ্ধা করে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে জনস্বার্থ ও তথ্যের অবাধ প্রবাহের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।