
এস, এম আরাফাত আলী
নড়াইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে নবগঙ্গা নদীর তীরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। চিত্রা ও নবগঙ্গার প্লাবনভূমিতে লুকিয়ে থাকা নানান পুরাকীর্তির মধ্যে লোহাগড়া উপজেলার রায়গ্রামের জোড় বাংলা মন্দিরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি কেবল স্থানীয় জনগণের কাছে একটি সাধারণ প্রার্থনালয় নয়, বরং এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা অঞ্চল ও তার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এক অমূল্য দলিল। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃত এই স্থাপনাটি নড়াইলের অতীত গৌরব ও স্থানীয় স্থাপত্যরীতির অনন্য স্মারক হিসেবে কালের আবর্তে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে।
ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত দিক থেকে রাধাগোবিন্দকে উৎসর্গীকৃত এই মন্দিরটির নির্মাণকাহিনীর সাথে যুক্ত রয়েছে তৎকালীন রাজা সীতারামের প্রতাপশালী ইতিহাসের অধ্যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, সীতারাম রাজার বিখ্যাত সেনাপতি মেনাহাতির অনুজ রামশঙ্কর ১৭২৪ সালে মন্দিরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। মন্দিরটির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন শিব মন্দিরের গায়ে খোদিত শিলালিপি থেকে এর সময়কাল সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। তৎকালীন রাজা ও তার বাহিনীর বীরত্বপূর্ণ অতীত এবং আধ্যাত্মিক চর্চার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই স্থাপত্যটি অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের সামাজিক রূপরেখাকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।
স্থাপত্যশৈলীর বিচারে এটি তৎকালের বহুল প্রচলিত দোচালা জোড় বাংলা রীতির অনুসরণে নির্মিত। পাশাপাশি যুক্ত দুটি দোচালা চালের নকশা মন্দিরটিকে এক ভিন্ন ধরনের আকৃতি প্রদান করেছে। পরিমাপের দিক থেকে প্রতিটি দোচালা ঘরের বাইরের অংশ ২৮ ফুট বাই ২২ ফুট ১০ ইঞ্চি এবং ভেতরের অংশ ১৪ ফুট ৪ ইঞ্চি বাই ১৪ ফুট ৪ ইঞ্চি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। ছাদের নিখুঁত গঠন ও পরিমিত নকশা প্রমাণ করে সে সময়ের কারিগরদের স্থাপত্য প্রকৌশলগত দক্ষতা কতটা উন্নত ছিল। একই আঙিনায় শিব মন্দির ও রাধাগোবিন্দ মন্দিরের সহাবস্থান তৎকালীন সনাতন ধর্মীয় কাঠামোর বৈচিত্র্য ও সংহতির এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে।
বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হওয়ায় এই প্রাচীন কীর্তিটির বাহ্যিক কাঠামো কিছুটা সুরক্ষিত থাকলেও, এর প্রতিটি ইট ও দেয়ালের কারুকাজে মিশে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন স্মৃতি। নদীর রূপালী স্রোত আর রায়গ্রামের মেঠো পথের সান্নিধ্যে অবস্থিত জোড় বাংলা মন্দিরটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে এক চিরন্তন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সীতারাম রাজার আমলের ইতিহাস অনুধাবন করতে এবং মধ্যযুগীয় বাংলার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে এই মন্দিরটি এক পরম তীর্থক্ষেত্র হিসেবে আজও তার পরিচিতি ধরে রেখেছে।