
এস, এম আরাফাত আলী
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে আত্মত্যাগের যে মহিম্মান্বিত গাথা রচিত হয়েছে, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে যশোর অঞ্চলের ৮ নম্বর সেক্টরে যোগ দিয়ে তিনি মাতৃভূমির মুক্তির জন্য অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। সেই বছর ৫ সেপ্টেম্বর সুতিপুরের গোয়ালহাটি গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর হঠাৎ আক্রমণ ও ভারী গোলাবর্ষণের মুখে পাঁচজনের একটি টহল দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এই মহান বীর। সম্মুখযুদ্ধে আহত সহযোদ্ধা সিপাহী নান্নু মিয়াকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে যেমন তিনি শত্রুর মোকাবেলা করেন, তেমনি পরবর্তীতে মর্টারের আঘাতে নিজে মারাত্মকভাবে জখম হয়েও সহযোদ্ধাদের নিরাপদে পিছু হটার সুযোগ করে দিতে একাকী রাইফেল চালিয়ে যান। একপর্যায়ে হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে নির্মম শাহাদাতবরণ করেন তিনি। যুদ্ধক্ষেত্রের নিকটস্থ ঝোপ থেকে উদ্ধার করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী যশোরের কাশীপুরে তাঁকে সমাহিত করা হয়। মাতৃভূমির স্বাধীনতায় এমন অতুলনীয় সাহসিকতা ও বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ বেসামরিক-সামরিক সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করে।
এই অমর শহীদের দেশপ্রেম ও ত্যাগের চেতনাকে পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়ে প্রজ্বলিত রাখতে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ভূমিতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখ কমপ্লেক্স’। নড়াইল জেলার চণ্ডিবরপুর ইউনিয়নের যে মহিষখোলা গ্রামে ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এই মহানায়কের সম্মানার্থে পরবর্তীতে সেই গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘নূর মোহাম্মদ নগর’। এই ঐতিহাসিক গ্রামেই ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় দৃষ্টিনন্দন স্মৃতি কমপ্লেক্সটি। এটি কেবল একটি সাধারণ ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, বরং বাঙালির বীরত্বগাথা ও জাতীয় চেতনার এক প্রদীপ্ত পাঠশালা। জন্মস্থানে বীরশ্রেষ্ঠের মর্যাদা রক্ষায় গঠিত ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত এই চত্বরটি প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীকে টেনে আনে।
গাম্ভীর্যপূর্ণ ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে নির্মিত এই কমপ্লেক্সটি প্রশাসনিক ও মানসিকভাবে এক অনন্য শ্রদ্ধাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে। মূল ভবনটিতে চমৎকার কারুকার্য এবং শান্ত ও ধূসর রঙের ব্যবহার এক গভীর পবিত্রতার আবহ সৃষ্টি করেছে। কমপ্লেক্সের ভেতরে রয়েছে একটি সুসমৃদ্ধ ‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’। এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে তাঁর ব্যবহৃত নানা ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন, দুর্লভ আলোকচিত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান নথিপত্র, যা দর্শনার্থীদের সরাসরি ১৯৭১ সালের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এ ছাড়া কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে একটি সুদৃশ্য মসজিদ, বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের বাসভবন এবং সমসাময়িক সুসংগঠিত পরিকাঠামো রয়েছে। চারপাশের সবুজ সমারোহ ও সুবিশাল খোলা মাঠ দর্শনার্থীদের মনে জাগিয়ে তোলে গভীর এক দেশপ্রেমের অনুভূতি। প্রতি বছর তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দিবসে এখানে আড়ম্বরপূর্ণ নানা সরকারি ও বেসরকারি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়, যা নতুন প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে উদ্বুদ্ধ করে চলেছে।