
বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় মানবপাচারের এক ভয়ংকর সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা রিফাত হোসেনকে (২৯) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দীর্ঘদিন ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই পাচারকারী সম্প্রতি বিয়ের উদ্দেশ্যে দেশে ফিরলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২৫ জানুয়ারি তাকে আটক করা হয়। এক ভুক্তভোগীর দায়ের করা সুনির্দিষ্ট মামলার প্রেক্ষিতে সিআইডির একটি চৌকস দল এই অভিযান পরিচালনা করে। রিফাতের এই গ্রেপ্তারকে মানবপাচার দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তার বিরুদ্ধেই মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সহজ-সরল মানুষকে লিবিয়ার মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
সিআইডি ও পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, রিফাত হোসেন একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের দেশীয় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করতেন। তিনি প্রথমে ইউরোপে পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়ে যুবকদের সংগ্রহ করতেন এবং পরবর্তীতে তাদের লিবিয়ার মরুভূমি ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পাচার করে দিতেন। সেখানে পৌঁছেই শুরু হতো আসল বিভীষিকা; ভুক্তভোগীদের একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হতো, যারা বন্দিশালায় আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করত। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুক্তিপণের টাকা দিতে দেরি হলে বা অস্বীকার করলে ভুক্তভোগীদের ওপর চালানো হতো অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। রিফাত মূলত এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
বর্তমানে রিফাত হোসেনের বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন এবং প্রতারণার ধারায় কঠোর আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, রিফাতকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য রাঘববোয়ালদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাচারকৃত অর্থ কোন চ্যানেলে বিদেশে পাঠানো হয়েছে এবং দেশে কার কার কাছে এই টাকার ভাগ যেত, সেই অর্থপাচারের বিষয়টিও নিবিড়ভাবে তদন্তাধীন রয়েছে। আদালতের নির্দেশে তাকে রিমান্ডে নিয়ে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে যাতে এই আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের প্রতি বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। কোনো ধরনের লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তি বা দালালের প্রলোভনে পড়ে জীবন ঝুঁকিতে না ফেলার জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি নিবন্ধিত এজেন্সি এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রিফাতের মতো অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মানবপাচারের মতো জঘন্য অপরাধ অনেকাংশেই কমে আসবে বলে মনে করছে সচেতন মহল।