
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় কৃষি খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। চলতি মৌসুমে বিশেষ করে হলুদ ও বেগুনি রঙের ফুলকপির বাম্পার ফলন স্থানীয় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। এক সময় শখের বশে দু-একটি জমিতে চাষ হলেও এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রঙিন ফুলকপি চাষে ঝুঁকছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। অনুকূল আবহওয়া, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং কৃষি বিভাগের সঠিক নির্দেশনায় এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। সাদা ফুলকপির তুলনায় পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং বাজারে উচ্চমূল্য পাওয়ায় সাধারণ চাষিদের মাঝে এই রঙিন সবজি চাষ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে।
উপজেলার কৃষি অর্থনীতির এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রযুক্তির সমন্বয়। বিশেষ করে খর্ণিয়া এলাকার আদর্শ কৃষক আবু হানিফ মোড়লের সাফল্য ডুমুরিয়ার অন্যান্য কৃষকদের অনুপ্রাণিত করছে। তিনি মাত্র ৩৩ শতক জমিতে ‘ক্যারোটিনা ইয়েলো’ জাতের হলুদ ফুলকপি চাষ করে প্রায় এক লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করেছেন। আবু হানিফের মতে, এই জাতের ফুলকপি সাধারণ কপির চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক এবং এতে প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন থাকায় স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের কাছে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। শুধু খর্ণিয়া নয়, মাগুরাঘোনা ইউনিয়নের শাহদাত হোসেন ও ববিতা সরকারের মতো কৃষকরাও ২০ বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে রঙিন ফুলকপি চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন।
বাজার বিশ্লেষণের তথ্যানুযায়ী, যেখানে সাধারণ সাদা ফুলকপি কেজিপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে রঙিন ফুলকপি পাইকারি ও খুচরা বাজারে ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি করা যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি হলেও লাভের অংক বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে বীজ, সার এবং পরিবেশবান্ধব কীটনাশক সহায়তা পাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য এই চাষ এখন অনেক সহজতর হয়ে উঠেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ডুমুরিয়ায় এবার প্রায় ২৮০ হেক্টর জমিতে ফুলকপির চাষ হয়েছে, যার মধ্যে রঙিন জাতের ফলন ছিল চোখে পড়ার মতো। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার চাষের পরিধি ও ফলন দুই-ই বেড়েছে যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
খুলনা কৃষি অঞ্চলের কর্মকর্তাদের মতে, ডুমুরিয়ার মাটি ও আবহাওয়া উচ্চমূল্যের এই রঙিন সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, কৃষকদের প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও উন্নত মানের বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করার ফলেই এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। আগামীতে এই চাষ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। উৎপাদিত এই বিশেষ জাতের ফুলকপি এখন কেবল স্থানীয় চাহিদা মিটাচ্ছে না, বরং ট্রাকভর্তি হয়ে দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরের বাজারেও পৌঁছে যাচ্ছে। ডুমুরিয়ার এই সবুজ বিপ্লব ও রঙিন ফুলকপির সাফল্য খুলনার কৃষি চিত্রকে জাতীয় পর্যায়ে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।