
বর্তমান সময়ে প্রথাগত পেশার বাইরে সৃজনশীল ও লাভজনক কাজের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ডুমুরিয়া উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা করুণা বিশ্বাস। সরকারি চাকরির গুরুদায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নিজের বাসায় গড়ে তুলেছেন বিদেশি পাখি লাভ বার্ডের এক নান্দনিক সংগ্রহশালা। সম্প্রতি ডুমুরিয়ার একটি আবাসিক প্রকল্পে তার এই উদ্যোগ পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, বাহারি রঙের এসব পাখির কিচিরমিচির শব্দে পুরো পরিবেশ এক অন্যরকম মুগ্ধতায় ভরে আছে। মূলত শখের বশে শুরু করলেও বর্তমানে এটি তার জন্য একটি বাড়তি আয়ের চমৎকার উৎসে পরিণত হয়েছে। করুণা বিশ্বাসের মতে, পড়াশোনা বা চাকরির কোনো ক্ষতি না করেই যে কেউ স্বল্প পরিসরে এই পাখি পালন করে লাভবান হতে পারেন, কারণ লাভ বার্ড পালনে জায়গার প্রয়োজন হয় খুবই সামান্য এবং ঝক্কি-ঝামেলাও তুলনামূলক অনেক কম।
আফ্রিকার আদি নিবাস হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে লাভ বার্ড অত্যন্ত সহজলভ্য এবং দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ও চাহিদা দুই-ই বাড়ছে। এই পাখির শারীরিক সৌন্দর্য, বিচিত্র রঙের সমাহার এবং সুমধুর কণ্ঠস্বর যে কাউকেই আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে একে অপরের প্রতি এদের গভীর ভালোবাসা ও মমতা প্রদর্শনের আচরণের কারণেই এদের নাম হয়েছে লাভ বার্ড। করুণা বিশ্বাস জানান, ১৮-১৮-২৪ ইঞ্চি মাপের ছোট খাঁচায়ও এই পাখি অনায়াসেই পালন করা সম্ভব। ডুমুরিয়ার স্থানীয় আবাসিক প্রকল্পগুলোতেই এ ধরনের মানসম্মত খাঁচা কিনতে পাওয়া যায়। তবে ওড়াউড়ির সুবিধার জন্য খাঁচার বাইরে ব্রিডিং বক্স স্থাপন করা উত্তম। সঠিক তাপমাত্রা অর্থাৎ ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখলে এবং সপ্তাহে অন্তত একদিন খাঁচা পরিষ্কার করলে এই পাখিগুলো বেশ সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকে। প্রথমদিকে এক জোড়া দিয়ে শুরু করে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ একবার সফলভাবে বাচ্চা দিলেই বিনিয়োগের টাকা উঠে আসে।
খাবার-দাবারের ক্ষেত্রে লাভ বার্ড বেশ মিতব্যয়ী এবং সহজলভ্য খাবারে অভ্যস্ত। এদের প্রধান খাদ্য হলো সিড মিক্স, যা চিনা, কাউন, সূর্যমুখীর বীজ, কুসুম ফুলের বীজ এবং সরিষা ও গমের মিশ্রণে তৈরি করা হয়। এর পাশাপাশি কলমি শাক, সজনে পাতা এবং বিভিন্ন ফলমূল এদের সুস্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। বিশেষ করে প্রজননকালীন সময়ে এগফুড এবং ভেজানো রুটি দিলে বাচ্চাদের দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। তবে বাজারের কেনা খাবারে ধুলোবালি থাকার সম্ভাবনা থাকায় সেগুলো ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই সফল খামারি। মাঝেমধ্যে অ্যাপেল সিড ভিনেগার বা অ্যালোভেরা মিশ্রিত পানি দিলে পাখির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। শীতকালে খাবারের দাম কিছুটা বাড়লেও লাভ বার্ডের প্রজনন ক্ষমতা ভালো হওয়ায় সার্বিকভাবে এটি একটি লাভজনক বিনিয়োগ।
লাভ বার্ড পালনের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এদের লিঙ্গ নির্ধারণ করা, কারণ পুরুষ ও স্ত্রী পাখি দেখতে প্রায় একই রকম। নতুন পালকদের ক্ষেত্রে এটি কিছুটা কঠিন হতে পারে বিধায় অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া বা অন্তত একবার ডিম দিয়েছে এমন জোড়া কেনা নিরাপদ। ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোঃ আশরাফুল কবিরের মতে, ভালো ব্রিডারের কাছ থেকে সুস্থ-সবল পাখি কেনাই সফলতার চাবিকাঠি। তিনি জানান, কাটাবনের দোকান বা ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমেও এখন খুব সহজে পাখি কেনা-বেচা করা যায়। এমনকি বাংলাদেশে এমন কিছু বিরল প্রজাতির লাভ বার্ড রয়েছে যার এক জোড়ার দাম লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত হতে পারে। পাখির কোনো অসুখ হলে প্রাণিসম্পদ দপ্তরে চিকিৎসার সুব্যবস্থা রয়েছে, তবে এই পাখিরা সাধারণত খুব শক্ত সমর্থ হওয়ায় বড় কোনো সমস্যা হয় না। চাকরির পাশাপাশি করুণা বিশ্বাসের এই উদ্যোগ ডুমুরিয়ার অনেক তরুণ ও কর্মজীবীর জন্য একটি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।