
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ঢেউ পরিলক্ষিত হয়েছে। জেলার মোট ছয়টি আসনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, চারটিতে বিএনপি এবং দুটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। তবে এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে খুলনার তিন হেভিওয়েট ও বিতর্কিত প্রার্থীর পরাজয়। বিশেষ করে জামায়াতের আলোচিত প্রথম হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীর বিশাল ব্যবধানে পরাজয়, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের অপ্রত্যাশিত হার এবং বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত খুলনা-২ আসনে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পতন—খুলনার রাজনীতির নতুন মেরুকরণকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
খুলনা-১ (বটিয়াঘাটা-দাকোপ) আসনে জামায়াত ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়ে বিশ্বব্যাপী নজর কেড়েছিলেন কৃষ্ণ নন্দী। তবে ভোটের মাঠে তার সেই চমক কার্যকর হয়নি। বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খান ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, যেখানে কৃষ্ণ নন্দী পেয়েছেন মাত্র ৭০ হাজার ৩৪৬ ভোট। প্রায় ৫১ হাজার ভোটের এই বিশাল ব্যবধানে পরাজয়ের পেছনে স্থানীয় ভোটাররা ডুমুরিয়ার বাসিন্দাকে অন্য আসনে প্রার্থী করা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট বিভক্তিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। ১২ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮ জনই হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় এবং আমীর এজাজ খানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কাছে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে হয়েছে জামায়াতের এই আলোচিত প্রার্থীকে। উল্লেখ্য, খুলনায় বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে আমীর এজাজ খানই সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছেন।
সবচেয়ে নাটকীয় লড়াই হয়েছে খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে। এখানে জামায়াতের হেভিওয়েট প্রার্থী ও দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার মাত্র ২ হাজার ৬০৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। বিসিবির সাবেক পরিচালক ও বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আসগার লবি ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। ২০০১ সালের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম পরওয়ারের এই পরাজয় রাজনৈতিক মহলে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। জয়ের পরপরই লবি তার বিজয়ের খবর লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানকে ফোনে জানালে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়। এদিকে জামায়াত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ডুমুরিয়া উপজেলার হিন্দু ভোটারদের ভোট এবং কয়েকটি কেন্দ্রের সন্দেহজনক ফলাফল নিয়ে গোলাম পরওয়ারের পক্ষ থেকে ভোট পুনঃগণনার আবেদন করা হতে পারে। মূলত হিন্দু ভোটারদের সমর্থন এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাই লবিকে জয়ের মালা পরিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছে বিএনপি। দলটির একসময়ের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে পরাজিত হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তাকে ৫ হাজার ৫৮২ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে চমক দেখিয়েছেন জামায়াত নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। জামায়াত প্রার্থীর প্রাপ্ত ৯৩ হাজার ৭৭৯ ভোটের বিপরীতে মঞ্জু পেয়েছেন ৮৮ হাজার ১৯৭ ভোট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় কোন্দল এবং নগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাথে দূরত্বের কারণেই এই ভরাডুবি ঘটেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং সাবেক স্পিকার অ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলীর এই স্মৃতিধন্য আসনে জামায়াতের হানা স্থানীয় বিএনপি নেতৃত্বের জন্য একটি বড় সতর্কতা সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরাজয়গুলো খুলনার আগামীর রাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি করে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।