
দূর পরবাসে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর যে স্বপ্ন নিয়ে বুক বেঁধেছিলেন, তা নিমিষেই ধুলোয় মিশে গেল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ লেবাননে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর একটি নৃশংস ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কৃতি সন্তান তরুণ প্রবাসী শুভ কুমার দাস। মাত্র ২২ বছর বয়সী এই যুবকের আকস্মিক ও বর্বরোচিত মৃত্যুর খবর শ্রীপতিপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই সেখানে চলছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য ও শোকের মাতম। আদরের সন্তানকে হারিয়ে মা-বাবার বুকফাটা আর্তনাদ আর স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই একই ড্রোন হামলায় সাতক্ষীরা জেলার আরও দুই রেমিট্যান্স যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তাঁরা হলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের মোঃ নাহিদুল ইসলাম নাহিদ। মর্মান্তিক এই আকাশ হামলায় একসঙ্গে একই জেলার ৩ জন কর্মঠ যুবকের প্রাণহানির ঘটনায় সমগ্র সাতক্ষীরা জেলা জুড়ে এখন গভীর শোকের ছায়া ও স্তব্ধতা বিরাজ করছে।
লেবাননের যুদ্ধক্ষেত্রের নির্মম বাস্তবতার শিকার হওয়া শুভ কুমার দাস ছিলেন কলারোয়া উপজেলার কয়লা ইউনিয়নের শ্রীপতিপুর গ্রামের সুরঞ্জন দাস ও শিখা রানী দাস দম্পতির একমাত্র আশার প্রদীপ। পরিবারকে দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্ত করতে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদে আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে ধারদেনা করে লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। সেখানে গিয়ে তিনি একটি পশুপালনের খামারে কঠোর পরিশ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়ের মাইফাদুন এলাকায় একটি চারতলা ভবনে অন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে মেস করে থাকতেন শুভ। গত সোমবার (১১ মে) রাতে তাদের ওই আবাসিক ভবনটিকে লক্ষ্য করে ইসরাইলি বাহিনী আকস্মিক ড্রোন হামলা চালালে পুরো বহুতল ভবনটি মুহূর্তের মধ্যে ধসে মাটির সাথে মিশে যায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে শুভও ছিলেন। পরবর্তীতে সেখানে অক্ষত থাকা অন্য প্রবাসী বাঙালিদের মাধ্যমে কলারোয়ায় শুভর পরিবারের কাছে এই দুঃসংবাদটি পৌঁছায়। এর আগে ওই একই ধ্বংসস্তূপ থেকে শফিকুল ও নাহিদের মরদেহ উদ্ধারের খবর দেশে এসেছিল, আর সর্বশেষ শুভর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় নিহতের সংখ্যা তিনে দাঁড়াল।
বুকের মাণিককে হারিয়ে শুভর মা শিখা রানী দাসের কান্না যেন কিছুতেই থামছে না। বিলাপ করতে করতে তিনি জানান, আগামী ২২ মে শুভর লেবানন প্রবাস জীবনের ঠিক ৩ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। অথচ তার কয়েক দিন আগেই সব শেষ হয়ে গেল। ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ রোববার (১০ মে) সকালে শেষবারের মতো ছেলের মিষ্টি কণ্ঠস্বর শুনেছিলেন তিনি। সে সময় লেবাননের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে মা হিসেবে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করলে শুভ উল্টো মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, “মা, অনেক দূরে দূরে বোমা পড়ছে, আমাদের এখানে কোনো সমস্যা নেই। আমরা সবাই খুব ভালো আছি। আমায় নিয়ে তুমি একদম চিন্তা কোরো না।” কিন্তু নিয়তির পরিহাস, মায়ের সাথে বলা সেই আশ্বস্ত বাণীই যে শুভর জীবনের শেষ কথা হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। পরদিন সকালে শান্ত নামের এক ব্যক্তি ফোন করে জানান, শুভর থাকার জায়গায় বোমা পড়েছে। খবরটি পাওয়ার পর থেকে মা বারবার শুভর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কল দিলেও তা বন্ধ পাচ্ছেন। এখন হতভাগ্য এই মায়ের আকুল আকুতি, সরকার যেন শেষবারের মতো তাঁর সন্তানের মুখটি দেখার ব্যবস্থা করে দেয় এবং দ্রুত লাশ দেশে ফিরিয়ে আনে।
ছেলের অকাল মৃত্যুর ধাক্কা সামলাতে না পেরে মা শিখা রানী বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন এবং পুরো পরিবারটি এখন দিশেহারা। এই চরম সংকটের মুহূর্তে নিহতের পরিবারটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কলারোয়া উপজেলা প্রশাসন। কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আরিফুল ইসলাম ইতিমধ্যেই নিহত শুভর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং তাদের খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি জানান, যদিও সরকারিভাবে বা দূতাবাস থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি প্রশাসন পায়নি, তবুও সাতক্ষীরা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সব ধরনের মানবিক ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে। একই সাথে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শুভর মরদেহ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের জোরালো কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।