
মাত্র ২০০ টাকার ধার বাকিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে খুলনায় মসজিদের বারান্দায় ঘুমন্ত এক দিনমজুরকে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তির নাম মো. ডালিম গাজী। দীর্ঘ তদন্ত ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছে খুলনা মহানগরীর হরিণটানা থানা পুলিশ। ঘটনার প্রধান আসামি জয়নাল আবেদীন গাইনকে গ্রেপ্তার করার পর তিনি আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গত রবিবার (১৪ জুন) জবানবন্দি রেকর্ড শেষে বিজ্ঞ আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন। এর আগে শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগরীর কৈয়া বাজারের শ্রম বাজার থেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত জয়নাল আবেদীন সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার জগদীশকাটি গ্রামের কাশেম গাইনের ছেলে।
পুলিশের তদন্ত এবং মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের দুই দিন আগে দিনমজুর ডালিম গাজী তার সহকর্মী শ্রমিক জয়নাল আবেদীনের কাছ থেকে ২০০ টাকা ধার নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে জয়নাল তার পাওনা টাকা ফেরত চাইলে ডালিম বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। এই সামান্য টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে একাধিকবার কথা কাটাকাটি ও মৃদু উত্তেজনা তৈরি হয়। গত ২৪ মে রাতে ডালিম গাজী এবং জয়নাল আবেদীন উভয়ই হরিণটানা থানার জয়খালী বায়তুল মামুর মসজিদের বারান্দায় রাতযাপনের জন্য অবস্থান নেন। সেখানেও ঘুমানোর আগে ধার করা টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে পুনরায় বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বাকবিতণ্ডা থামিয়ে উভয়েই ঘুমিয়ে পড়েন। তবে জয়নালের মনের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। রাতের শেষ প্রহরে ডালিম যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন জয়নাল একটি ভারী ইট দিয়ে ডালিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করেন। আঘাতের ফলে ঘটনাস্থলেই ডালিমের মৃত্যু নিশ্চিত হয়। এরপর জয়নাল নিহতের পকেটে থাকা প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা চুরি করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন এবং নিজ এলাকায় আত্মগোপন করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর দিন অর্থাৎ গত ২৪ মে সকালে খুলনার হরিণটানা থানাধীন কৈয়া বাজারের জয়খালী ব্রিজ সংলগ্ন ওই মসজিদের বারান্দা থেকে ডালিম গাজীর মাথা থেঁতলানো রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় নিহতের পরিবারের এক সদস্য বাদী হয়ে হরিণটানা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার শুরুতে ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা ক্লু না থাকায় বিষয়টি পুলিশের কাছে অত্যন্ত রহস্যজনক এবং জটিল বলে মনে হয়েছিল। ঘটনার পর থেকে আসামি জয়নাল দীর্ঘদিন খুলনার চেনা শ্রমবাজারগুলো এড়িয়ে চলেছিলেন। তিনি নিজের পরিচয় আড়াল করতে বাগেরহাট, ফকিরহাটসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে থাকেন, যার ফলে তাকে শনাক্ত করা পুলিশের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল।
এই অন্ধকূপ পরিস্থিতি থেকে মামলার জট খুলতে তদন্ত কর্মকর্তা ও হরিণটানা থানার এসআই বদিউর রহমান প্রযুক্তির আশ্রয় নেন। তিনি কৈয়া বাজার, ডুমুরিয়া ও মোস্তর মোড়ের শ্রমবাজারসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি এবং ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে তা নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ শুরু করেন। ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন কৈয়া বাজারে ডালিমের সাথে জয়নাল আবেদীন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে অবস্থান করছিলেন। পরবর্তীতে সেই ভিডিও ফুটেজ স্থানীয় একজন ব্যক্তিকে দেখালে তিনি জয়নালকে সঠিকভাবে শনাক্ত করেন। এই সূত্র ধরে পুলিশ আসামির সন্ধানে জাল বিছায়। গত শনিবার দুপুরে জয়নাল আবেদীন পুনরায় কৈয়া শ্রমবাজারে কাজের সন্ধানে এলে ওত পেতে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাকে হাতেনাতে আটক করে।
থানায় নিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জয়নাল আবেদীন পুলিশের কাছে ডালিম গাজীকে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন এবং নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। পরে তিনি আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মতি প্রকাশ করলে পুলিশ তাকে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করে। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান শেষে বিচারকের নির্দেশে তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। সামান্য ২০০ টাকার জন্য একজন সহকর্মীকে এভাবে নির্মমভাবে খুন করার ঘটনাটি খুলনার স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষ ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।