1. bditwork247@gmail.com : Zahid Hassan : Zahid Hassan
  2. khulnarprotichchobi@gmail.com : khulnarprotichchob :
  3. shobuj.khulna@gmail.com : al masum Shobuj : al masum Shobuj
মহাত্মা গান্ধীর ‘মীরাবাঈ’ ও খুলনার গর্ব: ভজনসম্রাজ্ঞী যূথিকা রায়ের কালজয়ী জীবনগাথা - khulnarprotichchobi
১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| বর্ষাকাল| শুক্রবার| বিকাল ৩:১৭|
শিরোনামঃ
বিশ্বকাপের উন্মাদনায় রাত জাগছেন? খেলা দেখার পাশাপাশি ঘুম ঠিক রাখার চিকিৎসকের দাওয়াই ডিজিটাল নিরাপত্তায় গুগলের বিশেষ ফিচার: সার্চ ইঞ্জিন থেকে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলার সহজ উপায় বিশ্বকাপ ফুটবলের আড়ালে সাইবার প্রতারণার জাল: ফিফার ভুয়া ওয়েবসাইট নিয়ে এফবিআইয়ের সতর্কবার্তা মহাত্মা গান্ধীর ‘মীরাবাঈ’ ও খুলনার গর্ব: ভজনসম্রাজ্ঞী যূথিকা রায়ের কালজয়ী জীবনগাথা ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অনন্য মেলবন্ধন: ভৈরব ও পশুর তীরের প্রাচীন জনপদ খুলনার সেনহাটি দেশের অন্যতম চিত্রগ্রাহক তৈয়ব রহমান আর নেই গৃহপরিচারিকাকে নির্যাতন: খুলনায় পুলিশ দম্পতি কারাগারে সেনহাটী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে মা সমাবেশ–২০২৬ অনুষ্ঠিত কুমিরের আক্রমণে সুন্দরবনে নারী জেলে নিহত খুলনাসহ কয়েক বিভাগে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা

মহাত্মা গান্ধীর ‘মীরাবাঈ’ ও খুলনার গর্ব: ভজনসম্রাজ্ঞী যূথিকা রায়ের কালজয়ী জীবনগাথা

এস, এম আরাফাত আলী
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬
Spread the love

 

সঙ্গীত জগতের আকাশ থেকে যে কটি উজ্জ্বল নক্ষত্র সুরের মায়াজালে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম খুলনার কৃতী সন্তান ও কিংবদন্তি সঙ্গীত শিল্পী যূথিকা রায়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত তাঁর সঙ্গীত জীবনে তিনি বিশেষ করে ভক্তিমূলক ভজনগানে এক অনন্য ও অবিসংবাদিত উচ্চতা স্পর্শ করেছিলেন। কেবল ভজনই নয়, হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্রেও নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনি তাঁর অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ২০০টিরও বেশি হিন্দি এবং ১০০টিরও বেশি বাংলা চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক বা নেপথ্য সঙ্গীতে কণ্ঠ দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। সুরের এই মহিয়সী নারীর জন্ম ও শৈশবের শিকড় জড়িয়ে আছে খুলনার ঐতিহাসিক পুণ্যভূমি সেনহাটি গ্রামের মাটিতে।

১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ২০ এপ্রিল খুলনা জেলার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন যূথিকা রায়, যাঁর ডাকনাম ছিল রেণু। তাঁর পিতা সত্যেন্দ্র রায় ছিলেন একজন স্কুল ইন্সপেক্টর এবং মাতা ছিলেন স্নেহময়ী দেবী। শৈশব থেকেই গানের প্রতি এক সহজাত ও তীব্র অনুরাগ ছিল তাঁর। সেনহাটি গ্রামের তৎকালীন গায়িকা সুধীরা দাশগুপ্তা যূথিকার কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ হন এবং তাঁর প্রতিভাকে বিকশিত করতে কলকাতায় যাওয়ার পরামর্শ দেন। এই পরামর্শের ওপর ভিত্তি করেই ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র সাত বছর বয়সে বাবার সাথে কলকাতায় পাড়ি জমান যূথিকা। সেখানে প্রখ্যাত সুরকার কমল দাশগুপ্তের বড় ভাই বিমল দাশগুপ্তের কাছে গান শেখার জন্য তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলেও, ব্যস্ততার কারণে তিনি রাজী হননি। তবে দমে না গিয়ে যূথিকা কলকাতা বেতারকেন্দ্রে কণ্ঠ পরীক্ষায় অংশ নেন এবং কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই খালি গলায় রবীন্দ্রনাথের ‘আর রেখো না আঁধারে’ গানটি গেয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হন।

বাবার চাকরি সূত্রে ঘন ঘন বদলিজনিত কারণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটায় যূথিকার মা সপরিবারে কলকাতার চিৎপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তাঁর বড় বোন বেথুন কলেজে ভর্তি হন এবং যূথিকা বরানগরে জ্ঞানরঞ্জন সেনের কাছে ধ্রুপদী গানের নিবিড় তালিম নেওয়া শুরু করেন। এক শুভক্ষণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অসাধারণ কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ হন এবং কবির প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ধীরেন দাসের প্রশিক্ষণে যূথিকার প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড ‘স্নিগ্ধ শ্যাম বেণী বর্ণা’ প্রকাশিত হয়, যদিও কারিগরি কারণে রেকর্ডটি বাতিল হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রখ্যাত সুরকার কমল দাশগুপ্তের সুরে ও প্রণব রায়ের কথায় ‘আমি ভোরের যূথিকা’ এবং ‘সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে’ গান দুটি ১৯৩৪ সালের নভেম্বরে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হলে রাতারাতি বিপুল জনপ্রিয়তা পান তিনি। যূথিকার অনুরোধে কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই তাঁর জন্য ‘নীল যমুনার জল’ ও ‘হে কৃষ্ণ প্রিয়তমা’র মতো কালজয়ী গান রচনা করেন। ১৯৩৭ সালে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মদিনে কমল দাশগুপ্তের সাথে দ্বৈতকণ্ঠে গান গাওয়ার পাশাপাশি তাঁরই নির্দেশনায় অসংখ্য নজরুলসঙ্গীত রেকর্ডে ধারণ করেন যূথিকা। ১৯৩৮ সালের জুনে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত গীতিচিত্রমালায় প্রণব রায়ের কথা ও কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘পাহাড়-দেশের বন্ধু আমার’ ও ‘রূপ-কাহিনীর দেশে’ গান দুটিতে কণ্ঠ দিয়ে তিনি শ্রোতামহলে নিজের আসন আরও পাকাপোক্ত করেন।

যূথিকা রায়ের সঙ্গীত জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোর সাথে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে দিল্লী বেতারকেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল দেশাত্মবোধক গান ‘সোনে কা হিন্দুস্তান মেরা’। ওই বছরই কলকাতার দাঙ্গার সময় মহাত্মা গান্ধী যখন বেলুড় মঠে অবস্থান করছিলেন, তখন যূথিকা রায় তাঁকে নিজের কণ্ঠে ভজন শুনিয়ে মুগ্ধ করেন। যূথিকার ভজনে আবেগাপ্লুত হয়ে গান্ধীজী স্বয়ং তাঁকে ‘মীরাবাঈ’ উপাধিতে ভূষিত করেন, যা তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি। ১৯৪৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ধর্মতলায় ধর্মীয় সম্প্রীতির লক্ষ্যে আয়োজিত মহাত্মা গান্ধীর এক বিশাল জনসভার সমাপনী গান হিসেবে তিনি পরিবেশন করেছিলেন নজরুলের ‘ওরে নীল যমুনার জল’। সঙ্গীত জীবনের সমান্তরালে তিনি ‘ঢুলি’, ‘রত্নকার’ ও ‘ললৎকার’ নামের তিনটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় ও গান করেছিলেন।

সুর সাধনায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারত সরকারের সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বখ্যাত রেকর্ড কোম্পানি এইচএমভি তাঁকে সম্মানজনক ‘গোল্ড ডিস্ক’ প্রদান করে এবং ২০১২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার রবীন্দ্রসদনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করেন। ১০০টিরও বেশি বাংলা এবং ২০০টিরও বেশি হিন্দি চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ দেওয়া এই সুর সম্রাজ্ঞী ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যূথিকা রায় আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু ভৈরব তীরের সেনহাটি গ্রাম থেকে শুরু হওয়া তাঁর সুরের সেই অবিনশ্বর যাত্রা আজও উপমহাদেশের সঙ্গীতপিপাসু মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025