
আমাদের সমাজে একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, কৃমির সমস্যা কেবল শিশুদেরই হয়ে থাকে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও কৃমি সংক্রমণ এবং এর জটিলতার ঝুঁকি সমানভাবে বিদ্যমান। কৃমি ও অন্যান্য বহু ক্ষতিকর জীবাণু প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো কঠোরভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। খাবার প্রস্তুত, পরিবেশন এবং মুখে দেওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাসের কোনো বিকল্প নেই। একই সাথে রান্নার বাসনকোসন ও কাঁচা খাওয়া যায় এমন শাকসবজি বা ফলমূল খাওয়ার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধুয়ে নেওয়া জরুরি। মলত্যাগের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম হলেও, অনেক সময় অসচেতনতার কারণে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া খালি পায়ে মাটিতে হাঁটার মাধ্যমে কৃমি শরীরের ভেতর প্রবেশ করার পথ খুঁজে পায়, যা বড়দের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
শৈশব ও কৈশোরে স্বাস্থ্যরক্ষার সব নিয়ম শতভাগ মেনে চলা সবসময় সম্ভব হয় না বলেই শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন পড়ে। সবুজ ঘাসে বা মাটিতে খালি পায়ে দৌড়ানোর যে আনন্দ, তা থেকে সন্তানদের বঞ্চিত করা সমীচীন না হলেও এই বাড়তে থাকা বয়সের আনন্দের মাঝে পুষ্টিহীনতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে কৃমি। শরীরে পুষ্টির ঘাটতি হলে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় বিধায় কোনো প্রকার ঝুঁকি না নিয়ে প্রতি বছর নিয়মমাফিক তাদের কৃমির ওষুধ খাওয়ানো উচিত। তবে সাধারণ ও সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শিশুদের মতো ঢালাওভাবে প্রতি বছর ওষুধ খাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বড়দের মধ্যে মূলত যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, যেমন পঁয়ষট্টি বছর ঊর্ধ্ব প্রবীণ ব্যক্তি, কেমোথেরাপি নিচ্ছেন এমন রোগী কিংবা দীর্ঘ মেয়াদে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবনকারীরা কৃমি সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া যাঁরা নিয়মিত খালি পায়ে মাটিতে কাজ করেন বা হাঁটেন, যেমন কৃষক বা মাঠকর্মী, এবং গর্ভধারণে সক্ষম কিন্তু বর্তমানে গর্ভবতী নন এমন নারীরা এই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। কোনো কোনো এলাকায় কৃমির প্রাদুর্ভাব খুব বেশি থাকলে সরকারি উদ্যোগে প্রাপ্তবয়স্কদেরও এই ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
সাধারণত কৃমি প্রতিরোধের জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বছরে একবার চারশত মিলিগ্রামের একটি অ্যালবেনডাজল ট্যাবলেট সেবন করে থাকেন। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেসব কৃমির প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়, সেগুলো পুরোপুরি নির্মূল করতে অ্যালবেনডাজলের পাশাপাশি আইভারমেকটিন নামের আরেকটি ওষুধ সেবনের প্রয়োজন পড়ে। এই আইভারমেকটিনের সঠিক মাত্রা বা ডোজ নির্ধারণ করা হয় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওজনের ওপর ভিত্তি করে, যা প্রতি কেজি ওজনের জন্য সাধারণত দুইশত মাইক্রোগ্রাম হিসেবে হিসাব করা হয়। তাই এই ওষুধের সঠিক ও নিরাপদ ডোজ নিশ্চিত করতে সেবনের পূর্বে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়।
কৃমির ওষুধ খাওয়ার উপযুক্ত সময় নিয়ে অনেকের মনেই নানা ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে থাকে। তবে চিকিৎসকদের মতে, দিনে কিংবা রাতে অথবা খাওয়ার আগে বা পরে—যেকোনো সুবিধাজনক সময়েই এই ওষুধ খাওয়া সম্ভব। সবচেয়ে ভালো হয় যদি যেকোনো দুই বেলার প্রধান খাবার গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়টিকে বেছে নেওয়া যায়, যেমন দুপুরের খাবার খাওয়ার দুই-তিন ঘণ্টা পর ওষুধটি সেবন করা হলো এবং তার দুই-এক ঘণ্টা পর আবার রাতের খাবারের সময় হয়ে এলো। অনেকে রাতে ঘুমানোর আগে কৃমির ওষুধ খেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, কারণ ওষুধ খাওয়ার পর যদি মৃদু কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তবে রাতের বিশ্রামের ফলে তা সহজেই উপশম হয়ে যায়; যদিও রাতে খাওয়ার আলাদা কোনো বিশেষ ঔষধি গুণ নেই।
সাধারণত কৃমির ওষুধ খাওয়ার পর মৃদু বমি ভাব, বমি, পেটে হালকা ব্যথা, পাতলা পায়খানা, মাথা ঘোরানো, মাথাব্যথা, একটু ঝিমুনি ভাব, মৃদু বা মাঝারি ধরনের জ্বর কিংবা পেশিতে হালকা ব্যথার মতো সাধারণ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা সাময়িক এবং এতে ভয়ের কিছু নেই। তবে খুব কম ক্ষেত্রে তীব্র পেটব্যথা, চোখ বা প্রস্রাব সম্পূর্ণ হলুদ হয়ে যাওয়া কিংবা ত্বকে ফুসকুড়ি বা গোটা সৃষ্টির মতো বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে অনতিবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ সতর্কতার অংশ হিসেবে গর্ভাবস্থায় কোনোভাবেই কৃমির ওষুধ সেবন করা যাবে না এবং ওষুধ খাওয়ার আগে ও পরে অন্তত এক মাস পর্যন্ত কার্যকরী গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। গর্ভধারণের সামান্যতম সন্দেহ থাকলেও এই ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে। এছাড়া যেসব মায়েরা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন অথবা যাঁদের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধে অ্যালার্জি রয়েছে কিংবা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী রোগের ওষুধ চলছে, তাঁদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কৃমির ওষুধ সেবন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ওয়ানটাইম বা সাধারণ প্রতিরোধী ডোজের তুলনায় শরীরে ইতিমধ্যেই কৃমির তীব্র সংক্রমণ ঘটে থাকলে চিকিৎসার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ডোজ ও ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।