
যেন এক আয়না যেখানে আমরা শুধু অতীতের প্রতিচ্ছবি দেখি না, বরং বর্তমানের দায়ও খুঁজে পাই। কিছু আঘাত সময়কে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, আবার কিছু স্মৃতি যুগের পর যুগ বয়ে বেড়ায় রক্তাক্ত ক্ষত হয়ে। আমাদের জীবনের কিছু রাত হয়তো একটু বেশিই অন্ধকার, কিছু দিন হয়তো একটু বেশিই দীর্ঘ।
তবে এর পেছনে রয়েছে একটা নির্মম ঘটনা যা আমাদের প্রাত্যহিক সময়টাকেই যেন কয়েকগুন বাড়িয়ে দেয়। দিঘলিয়ার দেয়ারা গণহত্যা এমনই এক ক্ষত, যা শুধু একটি গ্রাম নয়, পুরো জাতির বুকের ভেতর চিরকাল জ্বলজ্বল করে থাকবে। কিছু সময়ের ব্যবধানে একটা গ্রাম, কতগুলো পরিবার, সব শেষ। নিশ্চিত মৃত্যুকে সামনে দেখে তারা ত্যাগ করেছে দেহ। মানুষ হিসেবে শেষকৃত্যের অধিকারটাও দেওয়া হয়নি তাদের। বিনা দোষে মৃত্যু আলিঙ্গন করেছে তাদের আর তারা সমাহিত হয়েছে মৃত্যুর কোলে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতার জন্য রক্তাক্ত সংগ্রাম। পাকিস্তানি সেনারা শুধু মুক্তিকামীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি, তারা নিরীহ গ্রামবাসীকেও নির্মমভাবে হত্যা করেছে। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার দেয়ারা গ্রাম ছিল মুক্তিকামী মানুষে পরিপূর্ণ। কিন্তু সেই সাহসী গ্রামের মানুষই হয়েছিল দুঃসাহসী হত্যাযজ্ঞের শিকার।
২৭ আগস্ট, ১৯৭১। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়ায়নি। পাকিস্তানি সেনারা রাজাকারদের সহযোগিতায় দেয়ারা গ্রামে প্রবেশ করে। তারা গ্রাম ঘিরে ফেলে, একে একে মানুষকে ধরে নিয়ে যায়। অভিযোগ ছিল, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে। সে দিন মোট ৬১ জন মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞ। ৬০ জনকে ঘটনাস্থলেই হত্যা করা হয়, মাত্র একজন অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। হত্যাকাণ্ড শেষে ২২ জনকে গণকবর দেওয়া হয় আর বাকিদের লাশ ভৈরব নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সেদিনের বেঁচে থাকা একমাত্র মানুষ সৈয়দ আবুল বাশার আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই ভয়াবহ স্মৃতি। শরীরে অসংখ্য আঘাতের দাগ নিয়েও তিনি বেঁচে ছিলেন, যেন ইতিহাসকেই সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য।
২৭ আগস্টের এই গণহত্যা শুধু একটি গ্রামকে শূন্য করেনি, পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল। অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে, অনেক শিশু এক নিমিষে
এতিম হয়ে যায়, অসংখ্য নারী হারান স্বামী-ভাই-পুত্র। দিঘলিয়ার দেয়ারা আর
আগের মতো ফিরে যেতে পারেনি। মানুষ আজও কান্নায় স্মরণ করে হারানো
প্রিয়জনদের। এ ঘটনার অভিঘাত শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও গভীর দাগ কেটেছে।
দেয়ারা গণহত্যা আমাদের শেখায় স্বাধীনতা বিনামূল্যে আসে না। এই রক্তাক্ত অধ্যায় প্রমাণ করে, দমন-পীড়ন যতই নির্মম হোক, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কখনো দমিয়ে রাখা যায় না। আজকের প্রজন্মের কাছে এর শিক্ষা হলো- ইতিহাস ভুলে গেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের অস্বীকার করি। আমাদের দায়িত্ব হলো এই দিনগুলোকে স্মরণ রাখা, সম্মান জানানো, আর স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করা।