
এস, এম আরাফাত আলী
বাংলা সাহিত্যের স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ‘কিরীটি রায়’-এর স্রষ্টা ডা. নীহাররঞ্জন গুপ্ত পিতার কর্মসূত্রে ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর নাড়ির টান ছিল বাংলাদেশের মাটিতে। নড়াইল জেলা শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে অবস্থিত তাঁর পৈতৃক নিবাসটি আজ ইতিহাস ও সাহিত্যের এক নীরব সাক্ষী। প্রায় ৭০ শতক জমির ওপর গাছগাছালিতে ঘেরা ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই দ্বিতল ভবনটি একদিকে যেমন স্থাপত্যকলার নৈপুণ্য বহন করছে, অন্যদিকে সংরক্ষণের অভাবে কালের বিবর্তনে তা তার রূপ হারিয়ে বিবর্ণ হয়ে পড়ছে।
স্থাপত্য শৈলীর দিক থেকে এই প্রাচীন ভবনটি অত্যন্ত নান্দনিক ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। বাড়িটির উত্তর দিকের দোতলা অংশে বারান্দাসহ তিনটি কক্ষ ও একটি মন্দির রয়েছে, আর দক্ষিণের একতলা অংশে রয়েছে সাতটি কক্ষ এবং খিলানযুক্ত সরু বারান্দা। ভবনের ভেতরে প্রতিটি ঘরে সেকালের ঐতিহ্যবাহী একাধিক কুলঙ্গী ও দেয়াল আলমারি চোখে পড়ে। এ ছাড়া দরজা, জানালা ও দেয়াল আলমারিতে কাঠের সূক্ষ্ম কারুকার্যময় ফুল ও লতাপাতার অলংকরণ গৃহটিকে এক অনন্য দর্শনীয় রূপ দিয়েছে। প্রবেশপথের দিক দিয়েও বাড়িটি স্বতন্ত্র; এর দুটি ভিন্ন প্রবেশমুখ রয়েছে এবং বাড়ির সামনের অংশে রয়েছে একটি মনোরম পুকুর।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই সাহিত্যিকের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে ও নতুন প্রজন্মকে শিল্পকলার প্রতি আগ্রহী করতে স্থানীয় উদ্যোগে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটেছিল। ৯০-এর দশকে ইতনার চিত্রশিল্পী আলী আজগর রাজা এবং স্থানীয় শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র বিশ্বাস নীহাররঞ্জন গুপ্তের এই বাড়িতে শিশুদের চিত্রকলা শিক্ষার জন্য ‘শিশু স্বর্গ-২’ গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী প্রয়াত এস এম সুলতান উদ্বোধন করেছিলেন। তবে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুদানের অভাবে একপর্যায়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঐতিহ্যবাহী ও ইতিহাস-সমৃদ্ধ এই ভবনটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে।
১৯৮৬ সালের ২০ জানুয়ারি কলকাতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহীয়সী লেখক শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া পৈতৃক ভিটাটি উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ অনেকটাই জীর্ণ ও মলিন। নড়াইলের ইতনা গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি দ্রুত সংস্কার ও যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে সাহিত্যপ্রেমী এবং দর্শনার্থীদের জন্য নতুন করে উন্মুক্ত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যাতে বাংলা সাহিত্যের এক মহান পুরোধার স্মৃতি চিরভাস্বর হয়ে থাকে।