
আল মাসুম সবুজ
খুলনা শহরের ব্যস্ততম শহীদ হাদিস পার্কের দক্ষিণ পাশে এবং সার্কিট হাউজের ঠিক বিপরীতে বাবুখান রোডের প্রবেশমুখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক দৃষ্টিনন্দন সাদা দোতলা ভবন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতির আদলে নির্মিত এই রাজকীয় ভবনটি স্থানীয়দের কাছে খুলনার ‘হোয়াইট হাউজ’ নামে পরিচিত। নান্দনিক সাদা রঙের ডোরিক ও কোরিন্থিয়ান স্তম্ভ, সুশোভিত কারুকার্যময় রেলিং এবং বিশালাকার ফটক বেষ্টিত এই ঐতিহাসিক অট্টালিকাটি মূলত অবিভক্ত খুলনা ও বাগেরহাটের প্রতাপশালী জমিদার ভাই মহেন্দ্র নাথ ঘোষ ও শৈলেন্দ্র নাথ ঘোষের বসতবাড়ি। শৈলেন্দ্র নাথ ঘোষ কেবল একজন প্রভাবশালী জমিদার বা সফল ব্যবসায়ীই ছিলেন না, তিনি তখনকার জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি কেবল একটি জমিদার পরিবারের আভিজাত্যের প্রতীক নয়, বরং খুলনাঞ্চলের আধুনিকায়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের এক অমূল্য সাক্ষী।
খুলনা শহরের নাগরিক সভ্যতার বিকাশে এই ভবনের ভূমিকা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ইতিহাসবিদদের মতে, রূপসা পারের এই শহরে আধুনিক আলোর দিশা এনেছিল এই ঘোষ জমিদার বাড়িটিই। ১৯৩৪ সালে তৎকালীন সময়ে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ডায়নামো ব্যবহার করে এই বাড়িতেই প্রথম বিদ্যুৎ প্রজ্জ্বলন করা হয়, যা খুলনা শহরের ইতিহাসের প্রথম বিদ্যুৎ সংযোগের ঘটনা। এই ব্যক্তিগত উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ১৯৩৫ সালে সমগ্র খুলনা শহরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু হয়। আলোর পাশাপাশি শিক্ষার আলো ছড়াতেও এই পরিবারের অবদান ছিল অপরিসীম। ১৯৪০-এর দশকে রক্ষণশীল সমাজের গণ্ডি ভেঙে এই অঞ্চলজুড়ে নারী শিক্ষার যে নতুন জোয়ার এসেছিল, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল এই বাড়ির হাত ধরেই। ঘোষ পরিবারের সেই শিক্ষাবান্ধব উদ্যোগের ধারাবাহিক ফলেই পরবর্তীতে আজকের খ্যাতনামা বয়রা সরকারি মহিলা কলেজ আত্মপ্রকাশ করে।
সামাজিক ও বাণিজ্যিক পরিসরেও ঘোষ পরিবারের প্রভাব ছিল সর্বজনবিদিত। তৎকালীন বিনোদন জগতে সাড়া জাগানো খুলনার বিখ্যাত ‘নীলা হল’ সিনেমা হলটির মালিক ছিলেন শৈলেন্দ্র নাথ ঘোষ। দেশভাগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরবর্তীতে হলটি হাতবদল হয় এবং নতুন মালিক এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘পিকচার প্যালেস’, যা আজ অবধি খুলনাবাসীর স্মৃতিতে এক পরিচিত নাম হিসেবে টিকে আছে। ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক দেশভাগের পর এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শৈলেন্দ্র নাথ ঘোষ স্থায়ীভাবে কলকাতায় পাড়ি জমান। প্রস্থানকালে সম্পত্তির পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে সুদৃশ্য এই জমিদার বাড়ির মালিকানা চলে যায় তৎকালীন পাকিস্তানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও মন্ত্রী খান এ সবুর তথা আব্দুস সবুর খানের অধীনে।
কালের পরিক্রমায় স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নবযাত্রার সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে এই ঔপনিবেশিক স্থাপত্যটি। যদিও নিরাপত্তার খাতিরে বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য ভবনের ভেতরে অবাদে প্রবেশের সুযোগ নেই, তথাপি বাইরে থেকে রাজকীয় এই কাঠামোর সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত পথচারী ও ইতিহাসপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। শতবর্ষের ইতিহাস, ক্ষমতা হস্তান্তর এবং স্থাপত্যশৈলীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে ঘোষ জমিদার বাড়িটি আজও তিলোত্তমা খুলনার বুকে অতীত ঐতিহ্যের এক মহিমান্বিত প্রতীক হয়ে টিকে রয়েছে।