
এস, এম আরাফাত আলী
নড়াইল সদর উপজেলার চিত্রা নদীর তীরে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হাটবাড়িয়া জমিদার বাড়ি। উনিশ শতকের শুরুর দিকে যাত্রা শুরু করা এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি একসময় জাঁকজমক ও আভিজাত্যের প্রতীক হলেও প্রশাসনিক সংস্কার এবং সংরক্ষণের অভাবে আজ পুরোপুরি ধ্বংসাবশেষ ও পরিত্যক্ত ভিটায় পরিণত হয়েছে।
ঐতিহাসিক দলিল ও পারিবারিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নড়াইল জমিদার বংশের মূল পুরুষ কালীশংকর দত্ত তার বিশাল জমিদারি দুই পুত্রের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছিলেন। এই বিভাজনের অংশ হিসেবে বড় ছেলে রাম নারায়ণের ভাগে পড়ে মূল নড়াইল অংশ এবং ছোট ছেলে জয় নারায়ণের হাত ধরে হাটবাড়িয়ায় নতুন জমিদারি এস্টেট গড়ে ওঠে। জয় নারায়ণের সুযোগ্য পুত্র জমিদার গুরুদাস রায় এখানে মনোরম প্রাসাদ গড়ে তুলে স্বতন্ত্রভাবে জমিদারি পরিচালনা শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ‘হাটবাড়িয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া এস্টেট’ নামে খ্যাতি লাভ করে। জমিদার বংশের শেষ পুরুষ জিতেন্দ্রনাথ রায়ের সময়েও এই বাড়ির নাম ও প্রভাব প্রভূত ছিল, যা এখনও প্রবীণদের স্মৃতিতে ভাস্বর।
দেশভাগের পূর্বেই এই জমিদার পরিবারের সদস্যরা একে একে ভারতে পাড়ি জমালে রাজবাড়ির আলো স্থায়ীভাবে নিভে যায়। দেখভাল এবং পরিচর্যার অভাবে প্রাসাদটি ধীরে ধীরে ভগ্নদশায় উপনীত হয়। নড়াইলের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া সত্ত্বেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবহেলায় পড়ে থাকায় বর্তমানে রাজপ্রাসাদের মূল অবকাঠামো বিলীন হয়ে গেছে।
বর্তমানে এই ঐতিহাসিক ভিটায় অতীতের সমৃদ্ধির চিহ্ন হিসেবে কেবল একটি প্রাচীন দুর্গা মন্দির, সংলগ্ন রাজপ্রাসাদের মেঝে এবং শান বাঁধানো পুকুরঘাট অবশিষ্ট রয়েছে। চিত্রা নদীর পাড়ে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এই ধ্বংসাবশেষটি নড়াইলের অতীত অভিজাত আমলের মৌন স্মৃতি বহন করে চলেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে হারিয়ে যাওয়া এই পুরাকীর্তিটি অঞ্চলটির ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।