
“কিতনা হ্যায় বদনসিব জাফর,
দাফন কে লিয়ে
দো গজ জমিন ভি না মিলে কু-এ-ইয়ার মে।”
অর্থাৎ—
“কী দুর্ভাগা জাফর, প্রিয় শহরে দাফনের জন্য দুই গজ মাটিও জুটল না।”
কতটা গভীর বেদনা লুকিয়ে আছে এই পঙ্ক্তিতে! একসময় দিল্লির মসনদে বসেছিলেন যে মানুষ, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাকেই নিজের শহর থেকে হাজার মাইল দূরে নির্বাসিত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। আপনজন, পরিচিত শহর কিংবা পূর্বপুরুষদের মাটিতে শেষ ঠিকানা—কোনোটিই তার ভাগ্যে জোটেনি।
তিনি বাহাদুর শাহ জাফর, মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট। সম্রাট ছিলেন, কিন্তু তার সময়ের মুঘল সাম্রাজ্য তখন কেবল অতীতের ছায়া। প্রকৃত ক্ষমতা ক্রমেই চলে যাচ্ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। আর ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ তার জীবনের শেষ অধ্যায়কে নিয়ে যায় এক করুণ পরিণতির দিকে।
১৮৫৭-এর বিদ্রোহে প্রতীকী নেতৃত্ব
১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতীয় সেনাদের বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লে বিদ্রোহীরা দিল্লিতে এসে বাহাদুর শাহ জাফরকে নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানায়।
বৃদ্ধ সম্রাটের হাতে তখন কার্যকর সামরিক বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল না। তবু মুঘল সিংহাসনের ঐতিহ্য এবং তার পরিচয় বিদ্রোহীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।
বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশ বাহিনী দিল্লির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে। এরপর বাহাদুর শাহ জাফরের জন্য শুরু হয় বন্দিত্ব ও নির্বাসনের অধ্যায়।
হুমায়ূনের সমাধি থেকে বন্দিত্ব
দিল্লি পুনর্দখলের পর বাহাদুর শাহ জাফর হুমায়ূনের সমাধিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখান থেকে ব্রিটিশ কর্মকর্তা উইলিয়াম হডসন তাকে গ্রেপ্তার করেন।
যে দিল্লিতে একসময় তার পূর্বপুরুষেরা সাম্রাজ্য শাসন করেছেন, সেই দিল্লিতেই এবার তিনি হয়ে গেলেন বন্দি।
ব্রিটিশদের বিচারের মুখোমুখি করার পর তাকে ভারত থেকে নির্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দিল্লি থেকে রেঙ্গুন
১৮৫৮ সালে বাহাদুর শাহ জাফরকে দিল্লি থেকে সরিয়ে কলকাতায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে সমুদ্রপথে তাকে পাঠানো হয় রেঙ্গুনে—বর্তমান মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে।
এভাবেই নিজের শহর দিল্লির সঙ্গে তার সম্পর্ক কার্যত ছিন্ন হয়ে যায়।
রেঙ্গুনে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যে জীবনের শেষ কয়েকটি বছর কাটান তিনি। রাজমুকুট নেই, সাম্রাজ্য নেই, নিজের শহরে ফেরার অধিকারও নেই—আছে শুধু অতীতের স্মৃতি আর নির্বাসনের নিঃসঙ্গতা।
কবি জাফরের বেদনা
বাহাদুর শাহ জাফর শুধু একজন সম্রাট ছিলেন না, তিনি ছিলেন কবিও। তার কবিতায় ফুটে উঠেছে বিচ্ছেদ, বার্ধক্য, নিঃসঙ্গতা ও হারানোর বেদনা।
তার নামে বহুল প্রচলিত “দো গজ জমিন…” পঙ্ক্তিটি যেন তার নির্বাসিত জীবনের প্রতীক হয়ে আছে। তবে ইতিহাসের সতর্কতার জন্য উল্লেখ করা প্রয়োজন—পঙ্ক্তিটি জাফরের নামে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলেও এর প্রকৃত রচয়িতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
রেঙ্গুনেই শেষ নিঃশ্বাস
১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর, ৮৭ বছর বয়সে রেঙ্গুনে মৃত্যুবরণ করেন বাহাদুর শাহ জাফর।
দিল্লির শেষ মুঘল সম্রাটকে সেখানেই দাফন করা হয়। দীর্ঘ সময় তার কবরের সঠিক অবস্থানও স্পষ্টভাবে জানা ছিল না। পরে ১৯৯১ সালে রেঙ্গুনে একটি সমাধিস্থল আবিষ্কৃত হয়, যা বাহাদুর শাহ জাফরের কবর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
আজ সেখানে তার স্মৃতিবিজড়িত সমাধিসৌধ রয়েছে।
শেষ সম্রাটের শেষ ঠিকানা
মুঘল সাম্রাজ্যের যে বংশ দিল্লিকে কেন্দ্র করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ইতিহাসের অংশ ছিল, সেই বংশের শেষ সম্রাটের নিজের শহরে কবর হলো না।
সিংহাসন থেকে নির্বাসন, দিল্লি থেকে রেঙ্গুন—বাহাদুর শাহ জাফরের জীবন যেন মুঘল সাম্রাজ্যের পতনেরই শেষ প্রতিচ্ছবি।
আর তাই জাফরের নামে বহুল প্রচলিত সেই পঙ্ক্তি আজও ইতিহাসের এক বেদনাময় প্রতীক হয়ে আছে—
আপন শহরে সমাধির জন্য দুই গজ মাটিও জুটল না এক সম্রাটের।