
এস, এম আরাফাত আলী
নড়াইল জেলা সদরের রূপগঞ্জ এলাকায় চিত্রা নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন, যা নড়াইল বাঁধা ঘাট বা স্থানীয়দের কাছে রাজবাড়ী ঘাট নামে পরিচিত। নড়াইল শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া কলেজ সংলগ্ন স্থানে এই প্রাচীন স্থাপত্যটির অবস্থান। চিত্রা নদীর নিস্তব্ধ রূপালী জলের সাথে চমৎকার আবহ তৈরি করা এই ঘাটটি কেবল নৌপরিবহন কিংবা বিনোদনের কেন্দ্র ছিল না, বরং এটি যুক্ত হয়ে আছে বাংলা অঞ্চলের জমিদারি আমলের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাথে। ১৭৫৭ সালে ইংরেজ শাসন কায়েম হওয়ার পর রায় পরিবারের জমিদারি সূচনার ধারাবাহিকতায় জমিদার রাম রতন রায় এই ঘাটের প্রথম নির্মাণ কাজ শুরু করেন। মূলত জমিদারদের নৌ-বিহার, নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ, রাজপরিবারের নারীদের ধর্মীয় স্নান এবং বিভিন্ন উৎসবে প্রতিমা বিসর্জনের সুবিধার্থে অত্যন্ত নান্দনিক পরিকল্পনায় এই ঘাট গড়ে তোলা হয়েছিল। ভারতের গঙ্গা নদীর তীরেও একই স্থাপত্য নকশার আরও একটি ঘাট রয়েছে, যা এই ঘাটের ঐতিহাসিক সংহতি ও বৈচিত্র্যকে উপস্থাপন করে।
স্থাপত্যশৈলীর বিচারে নড়াইল বাঁধা ঘাটটি অনন্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। প্রাচীন গ্রীক স্থাপত্যরীতির অনুকরণে নির্মিত ডোরিক কলামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পাকা ছাউনিটি এই ঘাটের মূল আকর্ষণ হিসেবে দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। ঘাটের গা ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে রয়েছে জমিদারের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন ও একটি প্রাচীন মন্দির। শতাব্দী প্রাচীন এই ঘাটটির সঙ্গে মিশে আছে এ অঞ্চলের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবনের নানা স্মৃতিকথা। এছাড়া ধর্মীয় দিক থেকেও ঘাটের তাৎপর্য অপরিসীম; আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে রাজা সীতারাম প্রতিষ্ঠিত নিশিনাথ তলা ধর্মপীঠকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বৈশাখী তিথিতে হাজার হাজার পূর্ণার্থী এখানে একত্র হন। ধর্মীয় উৎসব বা পূজার মৌসুমে চিত্রার কোলজুড়ে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ, আলোয় ঝলমল করে ওঠে চারপাশ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত এই ঘাটের পাকা মন্দির প্রাঙ্গণে স্থানীয় ও দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে চারপাশ।
কালের বিবর্তনে পুরোনো ঘাটটি সংস্কারের মধ্য দিয়ে টিকিয়ে রাখার নানা প্রয়াস দেখা গেছে। প্রাচীন কাঠামোকে ধরে রেখে ২০০৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় অধিবাসীদের উদ্যোগে এর বেশ কিছু অংশ সংস্কার করা হয়। সম্প্রতি ঘাটের সংলগ্ন পুরোনো মন্দিরটিকেও নতুন রূপে দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলার কাজ চলছে, যা স্থানীয় ঐতিহ্যকে আরও নতুন উজ্জ্বলতা প্রদান করছে। প্রতিদিন বিকেলের কোলাহলমুক্ত অবসর কাটাতে নড়াইল শহরের বাসিন্দারা নদীর শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে এখানে ছুটে আসেন। নড়াইলের সমৃদ্ধ অতীত, স্থানীয় জমিদারি স্মৃতি এবং শিল্প-সাহিত্যের আবহে আবৃত চিত্রাপারের এই বাঁধা ঘাটটি আজও নড়াইলের সংস্কৃতি ও পর্যটনের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।