
প্রেম কখনো মানে না কাঁটাতারের সীমারেখা—এই কথারই এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভূপাল থেকে বাংলাদেশের খুলনা শহরে ছুটে আসা তরুণী ফারিন আলীর গল্প। আইনি জটিলতার মাঝে আটকে পড়া এই প্রেমকাহিনিতে মানবিকতার আলোকবর্তিকা হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার জনাব মোঃ জাহিদুল হাসান, বিপিএম (সেবা)।
বিগত ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ রাত ৯টার দিকে দৌলতপুর থানা আকস্মিক পরিদর্শনে যান কেএমপি কমিশনার। পরিদর্শনকালে নারী হাজতখানায় হিজাব পরিহিত এক মুসলিম নারীকে দেখতে পান তিনি। তার অপরাধ সম্পর্কে জানতে চাইলে বেরিয়ে আসে এক ব্যতিক্রমধর্মী ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনা।
মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভূপাল শহরের ব্লু মুন কলোনির বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী ফারিন আলী। পিতা রফিক আলী ও মাতা ফরিদা আলীর কন্যা ফারিনের সঙ্গে ছয় বছর আগে মুঠোফোনে পরিচয় হয় খুলনা শহরের দৌলতপুর মধ্যপাড়ার যুবক তাসিনের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয় রূপ নেয় গভীর প্রেমে। দুজনই চেয়েছিল সম্পর্কের পরিপূর্ণতা।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। ফারিনের কাছে ছিল না কোনো পাসপোর্ট বা বৈধ ভ্রমণ নথি। তবুও অদম্য সাহস আর প্রেমের টানে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মধ্যপ্রদেশ থেকে আসাম হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে সিলেট হয়ে খুলনায় পৌঁছান তিনি। অবশেষে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ফারিন ও তাসিন।
তবে সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গত ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ‘৯৯৯’ নম্বরে পাওয়া এক ফোনকলের প্রেক্ষিতে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে দৌলতপুর থানা পুলিশ ফারিনকে হেফাজতে নেয়।
থানার চার দেয়ালের ভেতর অসহায় অবস্থায় থাকা ফারিনের একমাত্র ভাষা ছিল হিন্দি। কমিশনার মহোদয়ের সামনে তিনি ভাঙা ভাঙা ভাষায় নিজের অনুভূতি প্রকাশের চেষ্টা করেন। তার চোখের ভাষা, স্বামী তাসিন ও শাশুড়ির করুণ আকুতি মানবিক পুলিশ কমিশনারকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে কমিশনার জনাব মোঃ জাহিদুল হাসান তাৎক্ষণিকভাবে বিজ্ঞ আইনজীবী, বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), ইমিগ্রেশন পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আইনি কাঠামোর মধ্যেই মানবিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেন তিনি।
সবশেষে কমিশনারের নির্দেশে ফারিনকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়। এ খবরে ফারিনের চোখের কোণে জমে ওঠে আনন্দাশ্রু—যা ছিল নতুন আশার প্রতীক।
ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার ও পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে এই ব্যতিক্রমী প্রেমকাহিনি একটি সুন্দর ও মানবিক পরিসমাপ্তি পাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। আইনের কঠোরতার মাঝেও যে মানবিকতা ও সহমর্মিতার জায়গা থাকে, এই ঘটনা তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।