
ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের ফতেহাবাদ জেলার ঢানি ভোজরাজ গ্রামে সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর ও আবেগঘন ঘটনার অবতারণা হয়েছে, যা একইসাথে আনন্দ এবং গভীর সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ৩৯ বছর বয়সী সুনীতা নামে এক নারী দীর্ঘ ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর তার একাদশ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, যে কি না এই পরিবারের প্রথম পুত্রসন্তান। দিনমজুর সঞ্জয় কুমার ও সুনীতা দম্পতির ঘরে এর আগে টানা ১০টি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত পুত্রসন্তানের আগমনে পরিবারটি তার নাম রেখেছে ‘দিলখুশ’। বর্তমানে এই দম্পতির বড় মেয়ের বয়স ১৮ বছর এবং দশম কন্যার বয়স মাত্র ২ বছর।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বিয়ের শুরু থেকেই এই দম্পতি একটি পুত্রসন্তানের আশায় ছিলেন। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে ৩৯ বছর বয়সে এসে শারীরিক জটিলতা এবং নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করেই আবারও গর্ভধারণ করেন সুনীতা। সঞ্জয় কুমার পেশায় একজন দিনমজুর হওয়া সত্ত্বেও তার দাবি, তিনি কখনোই তার মেয়েদের অবহেলা করেননি এবং সাধ্যমতো তাদের শিক্ষা ও লালন-পালনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে একটি বিড়ম্বনার বিষয় হলো, নিজের ১০ মেয়ের নাম একসাথে বলতে গিয়ে তিনি মাঝেমধ্যেই খেই হারিয়ে ফেলেন, যা একটি বিশাল পরিবারের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকে পরোক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলে।
এই ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত আনন্দের খবর হয়ে থাকেনি, বরং হরিয়ানার দীর্ঘদিনের বিদ্যমান লিঙ্গ বৈষম্য ও পুত্রসন্তানের প্রতি সামাজিক পক্ষপাতের বিষয়টিকে আবারও জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হরিয়ানায় প্রতি ১,০০০ জন পুরুষের বিপরীতে নারীর সংখ্যা মাত্র ৯২৩ জন, যা ভারতের জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশ উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুত্রসন্তানের জন্য বারবার সন্তান গ্রহণ করার এই প্রবণতা একদিকে যেমন নারীর স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে এটি সমাজে কন্যাসন্তানদের অবস্থানকে গৌণ করে রাখার মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেয়।
সুনীতা ও সঞ্জয়ের এই কাহিনীটি একদিকে যেমন একটি দম্পতির দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও আবেগের প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি আধুনিক সমাজব্যবস্থায় লিঙ্গ ভারসাম্যের পথে একটি বড় অন্তরায় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। হরিয়ানার মতো উন্নত রাজ্যেও যেখানে শিক্ষার হার বাড়ছে, সেখানে পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষায় দশটি কন্যাসন্তানের পর একাদশতম সন্তানের জন্ম দেওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আজও কতটা জরুরি। দিলখুশের আগমনে পরিবারে খুশির জোয়ার বইলেও, সমাজবিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে লিঙ্গ বৈষম্যের একটি নীরব উদাহরণ হিসেবেই চিহ্নিত করছেন।