
খুলনা মহানগরীর শিববাড়ী মোড়ের ব্যস্ততার মাঝে শান্ত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর। ১৯৯৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই স্থাপত্যটি কেবল একটি ভবন নয়, বরং এটি প্রাচীন বাংলার হাজার বছরের কৃষ্টি ও সভ্যতার এক অনন্য সংগ্রহশালা। ১৯৮৬ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গৃহীত এক মহাপরিকল্পনার ফলস্বরূপ কেডিএ থেকে প্রাপ্ত এক একর জমির ওপর নির্মিত এই জাদুঘরটি বর্তমানে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাদুঘর হিসেবে স্বীকৃত। এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর অনন্য অষ্টভুজাকৃতির স্থাপত্য শৈলী, যার ভেতরে সাজানো রয়েছে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসের নানা অধ্যায়। বর্তমানে প্রায় এক হাজার প্রত্নবস্তুর এক বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে এটি গবেষক ও পর্যটকদের জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য এখানে ব্রেইল পদ্ধতির নিদর্শনের সংযোজন জাদুঘরটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক করে তুলেছে।
জাদুঘরটির অভ্যন্তরে থাকা ছয়টি গ্যালারি যেন টাইম মেশিনের মতো দর্শকদের নিয়ে যায় প্রাচীন জনপদে। প্রথম গ্যালারিতেই রয়েছে যশোরের বিখ্যাত ভরত ভায়না বৌদ্ধমন্দির থেকে প্রাপ্ত বাংলাদেশের বৃহত্তম একক পোড়ামাটির ফলকচিত্রের অংশবিশেষ। এছাড়াও খান জাহান আলী (রহ.)-এর বসতভিটা ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রাচীন মসজিদ থেকে পাওয়া দুর্লভ নিদর্শনগুলো এখানে সযত্নে রক্ষিত। দ্বিতীয় গ্যালারিতে রয়েছে প্রাচীন মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহৃত চুড়ি, খেলনা এবং অলংকৃত ইটের সমাহার। উত্তরের মহাস্থানগড় ও মঙ্গলকোটের ঐতিহ্য সাজানো হয়েছে তৃতীয় গ্যালারিতে, যেখানে রৌপ্য মুদ্রা ও ছাঁচে ঢালা মুদ্রার এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। পূর্ববঙ্গের ইতিহাস জানতে দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখেন চতুর্থ গ্যালারি, যেখানে লালমাই-ময়নামতি অঞ্চলের শালবন বিহার ও আনন্দ বিহারের প্রত্নসম্পদ শোভা পাচ্ছে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ গ্যালারিতে যথাক্রমে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এবং গৌড় ও লালবাগ কেল্লার দুর্লভ নিদর্শনসহ শত বছরের পুরনো ফারসি লিপি ও রাজকীয় কাঠের খাট দর্শকদের ইতিহাসের সেই সোনালী দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকা এই জাদুঘরটি পরিদর্শনের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট সময়সূচী। গ্রীষ্মকালে মঙ্গলবার থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকে। প্রতি সপ্তাহের রবিবার ও সরকারি ছুটির দিনগুলোতে এটি বন্ধ থাকলেও সোমবার দিনটিতে অর্ধদিবসের জন্য দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানো হয়। মাত্র ২০ টাকার প্রবেশ মূল্যের বিনিময়ে যেকোনো সাধারণ মানুষ এখানে প্রবেশ করতে পারেন, যেখানে শিশুদের জন্য ফি রাখা হয়েছে মাত্র ৫ টাকা। তবে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য সার্কভুক্ত ও অন্যান্য দেশের নিরিখে ভিন্ন ভিন্ন প্রবেশ ফি নির্ধারিত রয়েছে। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং অতীতকে চাক্ষুষ করার আকাঙ্ক্ষা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই জাদুঘরে ভিড় জমান, যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমাদের শেকড়কে আরও নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।