
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিজয় ও শৌর্যবীর্যের সমান্তরালে মিশে আছে অগণিত মানুষের রক্ত, অশ্রু আর অবর্ণনীয় নির্যাতনের দীর্ঘশ্বাস। সেই ট্র্যাজিক অধ্যায়কে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরতে বিভাগীয় শহর খুলনায় গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। ২০১৪ সালের ১৭ মে অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র এই গণহত্যা জাদুঘরটি যাত্রা শুরু করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিজয় যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, গণহত্যা ও নির্যাতন নিয়ে সেভাবে অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখী চর্চা হয়নি—এমন অভাববোধ থেকেই এই আর্কাইভটির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। খুলনার চুকনগরে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ায় এই অঞ্চলটিকেই জাদুঘর স্থাপনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে, যা এখন আর কোনো আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করেছে।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাপ্ত একটি বিশেষ ভবনে এই জাদুঘরের কার্যক্রম বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বধ্যভূমি, গণকবর এবং নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষের জীবনতৃষ্ণার ইতিহাস ও তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা। এখানে কেবল নিথর বস্তু বা আলোকচিত্রই সংরক্ষিত নয়, বরং এটি একটি সক্রিয় গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। জাদুঘরের আর্কাইভে ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অসংখ্য বিরল ছবি, তথ্যচিত্র এবং বধ্যভূমি সংক্রান্ত অমূল্য দলিলপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের ভিত্তিতে জেলাভিত্তিক ‘গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘন্ট গ্রন্থমালা’ প্রকাশের প্রকল্পটি ইতিহাস চর্চায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এছাড়া খুলনা বিভাগে ইতিমধ্যে ২০টি বধ্যভূমি চিহ্নিত করে সেখানে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে, যা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস পুনরুদ্ধারের পথে এক বড় সাফল্য।
জাদুঘরটির কর্মকাণ্ড কেবল দেশের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। ভারতের ত্রিপুরা সরকারের সহযোগিতায় সেখানে একটি ভাস্কর্য উদ্যান নির্মাণ এবং ত্রিপুরা জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি গ্যালারি সাজানোর ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন যৌথ প্রদর্শনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা ও গণহত্যার চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ ডাকবিভাগ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সম্মানার্থে স্মারক খাম প্রকাশ করে এর জাতীয় গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে জাদুঘর প্রাঙ্গণে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের বিক্রয়কেন্দ্র, মুক্তমঞ্চ ও ক্যাফেটেরিয়া স্থাপন করা হয়েছে, যা একে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
ইতিহাসের পাঠকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এই জাদুঘরটি সম্প্রতি সংস্কৃতি ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্র’ প্রকল্পের আওতায় একটি বিশেষ সার্টিফিকেট কোর্স চালু করেছে। এর মাধ্যমে তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীরা তিন মাস মেয়াদী নিবিড় প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। এটি একটি বেসরকারি ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর বিকাশে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ও সমর্থন অত্যন্ত জরুরি। শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত কোনো নিদর্শন বা তথ্য দিয়ে সহায়তা করার পাশাপাশি আর্থিক অনুদানের মাধ্যমেও যে কেউ এই মহতী উদ্যোগের অংশীদার হতে পারেন। স্বাধীনতা মানে যে কেবল চারটি বর্ণ নয়, এর পেছনে লুকিয়ে থাকা লাখো প্রাণের আত্মত্যাগের সত্যকে অনুধাবন করতে এই আর্কাইভ ও জাদুঘরটি এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।