
আজকের কর্মব্যস্ত ও আধুনিক খুলনা মহানগরীর বুক চিরে যে রাজপথগুলো চলে গেছে, তার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে শতবর্ষের বসতি স্থাপনের রোমাঞ্চকর ইতিহাস। এক সময় রূপসা নদীর পূর্ব পাড়ে আঠারোবাঁকি নদীর কোল ঘেঁষে যে জনপদটি গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল, কালের পরিক্রমায় তা স্থান পরিবর্তন করে ভৈরব নদের দক্ষিণ পাড়ে থিতু হয়। আজকের যে সাজানো শহর আমরা দেখি, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৮৪২ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি বিভাগের অধীনে প্রথম মহকুমা সদর হিসেবে। প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে গড়ে ওঠা এই শহরটির প্রতিটি পাড়া বা মহল্লার নাম বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় সমাজ কাঠামো ও পেশার এক অনন্য সমীকরণ, যা অন্য অনেক প্রাচীন শহরের তুলনায় বিরল।
খুলনা শহরের আদি পর্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বর্তমান জেলা প্রশাসকের বাসভবন ও মির্জাপুর মাঠ সংলগ্ন এলাকা থেকেই মূলত নগরায়ণের বিস্তার শুরু হয়েছিল। প্রশাসনিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর জায়গার সংকুলান না হওয়ায় মানুষ ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে টুটপাড়া এবং বানিয়াখামারের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এক সময় এই এলাকাগুলো ছিল উলুখাগড়া ও বনভূমিতে ঢাকা জনশূন্য প্রান্তর। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেই চিত্রটি বদলে যেতে থাকে। লেখক ও গবেষকদের মতে, খুলনার পাড়াগুলোর নামকরণের পেছনে বংশীয় পদবি ও পেশাগত পরিচয়ের প্রভাব ছিল অত্যন্ত প্রকট। সরকারপাড়া, করপাড়া, রায়পাড়া বা বসুপাড়ার মতো নামগুলো যেমন হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বর্ণের মানুষের বসতিকে চিহ্নিত করে, তেমনি মুসলমানপাড়া, মিয়াপাড়া, মৌলভীপাড়া বা মুন্সীপাড়া নামগুলো মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থানের জানান দেয়।
পেশাভিত্তিক বসতির এই ধারাটি খুলনার মানচিত্রে এক বৈচিত্র্যময় জ্যামিতি তৈরি করেছে। বাইতিপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া বা ফারাজীপাড়ার মতো নামগুলো সেই সময়ের মানুষের জীবিকা ও জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। রেললাইন স্থাপনের সময় যখন উচ্ছেদ কার্যক্রম চলে, তখন কুণ্ডু ও কর্মকার সম্প্রদায়ের মানুষরা দোলখোলা মোড় সংলগ্ন এলাকায় বসতি গড়লে জন্ম নেয় কুণ্ডুপাড়া ও কর্মকারপাড়া। আবার বানিয়াখামারের উত্তরাংশে গন্ধ বণিক ও শঙ্খ বণিকদের আধিপত্যের কারণে গড়ে ওঠে বানিয়াপাড়া। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেই বর্তমান ইকবালনগরের মতো এলাকাগুলোতে বাগানবাড়ি তৈরির মাধ্যমে অভিজাত শ্রেণির বসতি স্থাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রশাসনিক সদরকে কেন্দ্র করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া এই বসতিগুলোই আজকের মহানগরীর মূল কাঠামো নির্মাণ করে দিয়েছে।
খুলনার এই নগর বিন্যাস কেবল ইট-পাথরের কোনো বিবর্তন নয়, বরং এটি এক জীবন্ত পাণ্ডুলিপি। এখানে প্রতিটি গলির নাম কোনো এক সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে। মির্জাপুর মাঠের দক্ষিণ সীমানা থেকে শুরু করে আজকের বিস্তীর্ণ মহানগরী পর্যন্ত যে পথ চলা, তার প্রতিটি ধাপে লুকিয়ে আছে মানুষের পরিচয় ও ঐতিহ্যের গল্প। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, আধুনিক খুলনার যে বাণিজ্যিক ও আবাসিক জৌলুস, তার সবটুকুরই উৎস ছিল এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাড়াগুলো। আজ সময়ের বিবর্তনে অনেক স্থাপত্য বদলে গেলেও পাড়াগুলোর নাম আজও বহন করে চলেছে সেই পুরনো খুলনার গন্ধ। এইভাবেই ঐতিহ্যের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে নির্মিত হয়েছে আমাদের প্রিয় খুলনা শহর।