
দৈনন্দিন জীবনে চলাফেরার সময় মাথায় ছোটখাটো চোট পাওয়াকে আমরা অনেকেই গুরুত্ব দিতে চাই না। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, মাথার সামান্য অবহেলাও ডেকে আনতে পারে চরম বিপর্যয়। বিশেষ করে ‘সাবডিউরাল হেমাটোমা’ নামক এক জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি নীরবে কেড়ে নিতে পারে মানুষের স্বাভাবিক জীবন। মূলত আমাদের মস্তিষ্কের চারপাশে থাকা সুরক্ষা আবরণ বা ডুরা ম্যাটারের নিচে রক্তক্ষরণ হয়ে যখন রক্ত জমাট বাঁধে এবং তা মস্তিষ্কের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, তখনই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগটি দুই ধরনের হয়ে থাকে—অ্যাকিউট বা তীব্র এবং ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী। বড় কোনো দুর্ঘটনার পরপরই যখন দ্রুত লক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন তাকে তীব্র হেমাটোমা বলা হয়, যা অত্যন্ত জরুরি অবস্থায় অস্ত্রোপচারের দাবি রাখে। অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক হেমাটোমা অনেকটা ধীরগতির বিষের মতো; যা বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মাথায় মৃদু আঘাত পাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
মাথায় আঘাত পাওয়ার পর কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয় বলে পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তীব্র বা ক্রমেই বাড়তে থাকা মাথাব্যথা, অকারণে বমি বমি ভাব কিংবা সরাসরি বমি হওয়া এই রোগের প্রাথমিক সংকেত হতে পারে। এ ছাড়া অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ভারসাম্যে সমস্যা দেখা দেয়, হাঁটাচলায় জড়তা আসে এবং কথা বলতে গিয়ে শব্দ জড়িয়ে যায়। স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, হঠাৎ করে বিভ্রান্ত বোধ করা কিংবা আচরণের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটা মূলত মস্তিষ্কে চাপের ইঙ্গিত দেয়। অনেক সময় ছোট কোনো আঘাত, যেমন বাথরুমে পিছলে যাওয়া বা সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মাথায় মৃদু ধাক্কা লাগার মতো ঘটনা থেকেও এই অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে। বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তি বা যারা নিয়মিত রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবন করেন, তাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের টিস্যু কিছুটা সংকুচিত থাকে বলে এই ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি থাকে।
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে এই প্রাণঘাতী সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ এখন অনেকটাই সহজতর। সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে এই রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। যদি জমাটবদ্ধ রক্তের পরিমাণ বেশি হয়, তবে অভিজ্ঞ সার্জনরা দ্রুত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেই রক্ত অপসারণ করে রোগীকে বিপদমুক্ত করেন। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ রোগীই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সক্ষম হন। তাই মাথায় যেকোনো ধরনের আঘাত পাওয়ার পর যদি আচরণ বা শারীরিক অবস্থায় সামান্যতম বিচ্যুতি নজরে আসে, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আপনার সামান্য সচেতনতা এবং দ্রুত পদক্ষেপই পারে একটি অমূল্য প্রাণকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে।