
বাসে, অফিসে কিংবা বিশ্রামের অবসরে-চারপাশে তাকালে এখন একটি সাধারণ দৃশ্যই চোখে পড়ে, আর তা হলো ঘাড় নিচু করে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে নিমগ্ন থাকা। প্রাত্যহিক জীবনের এই অতি সাধারণ অভ্যাসটিই এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘক্ষণ ঘাড় ঝুঁকিয়ে মোবাইল ব্যবহারের ফলে শরীরে যে অস্বাভাবিক চাপের সৃষ্টি হয়, তা কেবল সাধারণ ঘাড় ব্যথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে স্ট্রোকের মতো ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই সমস্যাটিকে ‘টেক্সট নেক সিনড্রোম’ বলা হয়, যা বর্তমান প্রজন্মের শারীরিক কাঠামোর ওপর এক অদৃশ্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মাথার স্বাভাবিক ওজন প্রায় ৫ কেজি হলেও, যখন ফোন দেখার জন্য ঘাড় ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত ঝুঁকিয়ে রাখা হয়, তখন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে ঘাড়ের ওপর এই চাপের পরিমাণ ২০ কেজিরও বেশি হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে এই অতিরিক্ত ভার বহন করতে গিয়ে ঘাড়ের মাংসপেশি, স্নায়ু এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর ফলে মস্তিষ্কে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্রেইন স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে যারা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা ধূমপানে অভ্যস্ত, তাদের জন্য এই ঝুঁকির মাত্রা আরও ভয়াবহ হতে পারে। এক সময় স্ট্রোককে কেবল প্রবীণদের রোগ মনে করা হলেও, বর্তমানে মোবাইল ব্যবহারের এই ভুল ভঙ্গিমার কারণে তরুণ সমাজও এই মরণব্যাধির কবলে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে অতিরিক্ত মোবাইল নির্ভরতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস এই ঝুঁকিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। ঘাড় বা মাথায় তীব্র ব্যথা হওয়া, হঠাৎ মাথা ঘোরা, হাত-পা অবশ হয়ে আসা কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে অবহেলা করা মোটেও উচিত নয়, কারণ এগুলো স্ট্রোকের প্রাথমিক সংকেত হতে পারে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় তা চোখের সমতলে রাখা এবং একটানা দীর্ঘ সময় নিচু হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থাকা অত্যন্ত জরুরি। প্রতি ২০ থেকে ৩০ মিনিট অন্তর বিরতি নেওয়া এবং ঘাড় ও কাঁধের সহজ কিছু ব্যায়াম করার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের জীবনকে সহজ ও গতিশীল করলেও এর অসচেতন ব্যবহার জীবনকেই সংকটাপন্ন করে তুলতে পারে। খুলনার প্রেক্ষাপটে শহর ও মফস্বলের বিশাল এক অংশ এখন স্মার্টফোন প্রযুক্তির আওতায়, তাই এই ‘টেক্সট নেক’ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। আজকের ছোট একটি ভুল অভ্যাস যেন আগামী দিনের পঙ্গুত্ব বা অকাল মৃত্যুর কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেজন্য এখনই জীবনযাপনের ধরনে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সুস্থ থাকতে কেবল চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে সঠিক শারীরিক ভঙ্গি ও সচেতনতাই হতে পারে আধুনিক এই স্বাস্থ্য বিপর্যয় থেকে বাঁচার প্রধান ঢাল।