
শিশুদের পেটে কৃমির সংক্রমণ এ দেশের একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্যগত সমস্যা হলেও এটি ঘিরে সাধারণ মানুষের মনে রয়েছে নানামুখী বিভ্রান্তি ও প্রাচীন ভুল ধারণা। অনেক মা-বাবাই মনে করেন যে শিশু অতিরিক্ত মিষ্টি বা চিনি জাতীয় খাবার খেলে পেটে কৃমির জন্ম হয়। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত করেছে। মিষ্টি কিংবা চিনির সাথে কৃমি সংক্রমণের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই, বরং এর আসল কারণ হলো যেকোনো ধরনের দূষিত ও অপরিচ্ছন্ন খাবার গ্রহণ করা। একইভাবে, শিশুর ঘুমের মধ্যে দাঁত কটমট করা কিংবা মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা ঝরলে অনেকেই তড়িঘড়ি করে কৃমির ওষুধ খাইয়ে দেন। অথচ বাস্তব সত্য হলো, পাঁচ থেকে সাত মাস বয়সী শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধির প্রক্রিয়াতেই একটু বেশি লালা ঝরতে থাকে, যার সাথে কৃমির কোনো দূরতম সংযোগও নেই। আবার অনেকের মধ্যে এমন একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস কাজ করে যে, প্রচণ্ড গরমের দিনে শিশুদের কৃমির ওষুধ খাওয়ানো যাবে না, যা চিকিৎসকদের মতে একদমই ঠিক নয়।
এই জাতীয় নানা বিভ্রান্তি সমাজে প্রচলিত থাকলেও তিতকুটে সত্য এই যে, বাংলাদেশে শিশুদের একটি বিশাল অংশ প্রতিনিয়ত কৃমি সংক্রমণের শিকার হচ্ছে। কৃমি শুধু শিশুর পেটে বাসই করে না, বরং এটি বাচ্চার শরীরে তীব্র পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা এবং নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। তাই এই অদৃশ্য শত্রু থেকে সন্তানদের সুরক্ষিত ও কৃমিমুক্ত রাখতে মা-বাবাকে সবসময় সর্বোচ্চ সচেতন থাকতে হবে। কৃমি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও মোক্ষম হাতিয়ার হলো স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা। এর জন্য যেকোনো খাবার তৈরি, পরিবেশন এবং মুখে দেওয়ার আগে অত্যন্ত ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কোনো বিকল্প নেই। খুব ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মাঝে এই জরুরি অভ্যাসটি রপ্ত করাতে হবে, যাতে তারা প্রতিবার খাবার স্পর্শ করার আগে নিজে থেকেই হাত ধুয়ে নেয়। পাশাপাশি শিশুদের হাত ও পায়ের নখ নিয়মিত কেটে সবসময় ছোট ও পরিষ্কার রাখতে হবে, কারণ নখের কোণে জমে থাকা ময়লাই কৃমির ডিমের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল।
পারিবারিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হলে শিশুদের মলমূত্র ত্যাগের পর এবং মা-বাবার ক্ষেত্রে বাচ্চার মলমূত্র পরিষ্কার করানোর পর প্রতিবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত। এর পাশাপাশি রান্নাঘরের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রান্নার পাতিল, চামচ এবং থালাবাসন নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বিশেষ করে মাংস, বিশেষত গরুর মাংস রান্নার সময় তা যেন পুরোপুরি সেদ্ধ হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে, কারণ আধাসেদ্ধ মাংসে কৃমির লার্ভা বেঁচে থাকার প্রবল ঝুঁকি থাকে। ঘরোয়া সুরক্ষার পাশাপাশি বাইরে চলাচলের ক্ষেত্রেও শিশুদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। টয়লেটে যাওয়ার সময় এবং বাড়ির বাইরে ধুলোবালিতে খেলার সময় যেন শিশুরা সবসময় পায়ে স্যান্ডেল বা জুতো পরে থাকে, সেই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া রাস্তার পাশে তৈরি হওয়া অপরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর ও খোলা দূষিত খাবার খাওয়ার ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝিয়ে শিশুকে তা পরিহার করতে সবসময় নিরুৎসাহিত করতে হবে।
ডিজিটাল এই যুগে অনেকেই বাড়িতে শখের বশে বিড়াল কিংবা কুকুর পুষে থাকেন। কিন্তু ঘরের সুরক্ষায় গৃহপালিত এই কুকুর ও বিড়ালকেও নিয়মিত বিরতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো আবশ্যক, অন্যথায় তাদের মাধ্যমেও মানবদেহে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। কৃমি নির্মূলের একটি বড় কৌশল হলো, যখন ওষুধ খাওয়ানো হবে তখন কোনো একক সদস্য নয়, বরং বাড়ির ছোট-বড় সব মানুষের একসঙ্গেই কৃমির ওষুধ খাওয়া উচিত, এতে করে একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে পুনরায় কৃমি ছড়ানোর চক্রটি ভেঙে যায়। বাজারে প্রচলিত বেশির ভাগ কৃমির ওষুধ সাধারণত দুই বছরের বেশি বয়সী বাচ্চাদের জন্য তৈরি হয়ে থাকে। তবে চিকিৎসাশাস্ত্রের আধুনিক অগ্রগতির ফলে আজকাল এক বছর বা তারও কম বয়সী শিশুদের উপযোগী অত্যন্ত নিরাপদ ওষুধও সহজলভ্য। অবশ্য খুব ছোট কিংবা নবজাতক শিশুকে যেকোনো ধরনের কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর পূর্বে মা-বাবার উচিত কোনো প্রকার নিজে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা।