
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোন এবং এর নিত্যনতুন অ্যাপসমূহ আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ ও গতিশীল করে তুলেছে, তেমনি এর আড়ালে তৈরি হচ্ছে এক নীরব নিরাপত্তা সংকট। প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার আড়ালে ফোনে থাকা বিভিন্ন অ্যাপ গোপনে ব্যবহারকারীদের অজান্তেই নানা ধরনের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক সময় এই তথ্য সংগ্রহের পরিধি ও গভীরতা সাধারণ ব্যবহারকারীর কল্পনার সীমানাকেও ছাড়িয়ে যায়, যা এক প্রকার অদৃশ্য নজরদারির শামিল। ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং এই অনাকাঙ্ক্ষিত গোপন নজরদারি সম্পূর্ণভাবে প্রতিহত করতে স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যবহারকারীকে কিছু সুনির্দিষ্ট ও সচেতনতামূলক কৌশল অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি।
অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য চুরি বা নজরদারি ঠেকানোর প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো ডিভাইসে থাকা অ্যাপগুলোর সংগৃহীত অনুমতিসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা। যেকোনো নতুন অ্যাপ ইনস্টল করার সময় সেটি ফোনের ঠিক কোন কোন সুবিধা বা তথ্য ব্যবহারের অনুমতি চাচ্ছে, তা গভীরভাবে লক্ষ্য করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, একটি সাধারণ টর্চলাইট অ্যাপ যদি তার মূল কাজের বাইরে গিয়ে ব্যবহারকারীর ভৌগোলিক অবস্থান, মাইক্রোফোন, ক্যামেরা কিংবা ফোনের যোগাযোগের তালিকায় প্রবেশাধিকার দাবি করে, তবে বিষয়টি অত্যন্ত সন্দেহজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, একটি আলোর অ্যাপের কার্যকারিতার সাথে এই ধরনের স্পর্শকাতর যন্ত্রাংশ বা তথ্যের কোনো যৌক্তিক সংযোগ নেই। এই ধরনের অপ্রাসঙ্গিক অনুমতি চাওয়ার অর্থই হলো অ্যাপটি গোপনে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পাঁয়তারা করছে, যা শুরুতেই রুখে দেওয়া উচিত।
একইভাবে, স্মার্টফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বা লোকেশন সার্ভিসের অনুমতি ব্যবহারের বিষয়টিও নিয়মিত পর্যালোচনা করা আবশ্যক। অনেক অ্যাপের কার্যকারিতার জন্য সার্বক্ষণিক লোকেশনের প্রয়োজন না থাকলেও তারা ব্যবহারকারীর গতিবিধির ওপর নজর রাখতে এই অনুমতিটি হাতিয়ে নেয়। এই ঝুঁকি এড়াতে ফোনের মূল সেটিংসে প্রবেশ করে কোন কোন অ্যাপ সবসময় লোকেশন ব্যবহারের অনুমতি পেয়ে আছে তা দেখে নেওয়া উচিত। যেসব অ্যাপের ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক অবস্থানের তথ্য জানার প্রয়োজন নেই, সেগুলোর জন্য ‘অলওয়েজ অ্যালাউ’ অপশনটি দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া দরকার। তার পরিবর্তে ‘হোয়াইল ইউজিং দ্য অ্যাপ’ অপশনটি নির্বাচন করে দিলে অ্যাপটি কেবল ব্যবহারের সময়ই লোকেশন ট্র্যাক করতে পারবে, ফলে ব্যাকগ্রাউন্ডে অপ্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের সুযোগ একবারে কমে যাবে।
লোকেশন ট্র্যাকিংয়ের পাশাপাশি স্মার্টফোনের মাইক্রোফোন এবং ক্যামেরা ব্যবহারের অনুমতি নিয়েও বিস্তর কারসাজি করে থাকে বিভিন্ন অ্যাপ। অনেক সময় ব্যবহারকারীরা অসচেতনভাবে এমন কিছু অ্যাপকে মাইক্রোফোন ও ক্যামেরার অ্যাক্সেস দিয়ে বসেন, যেগুলোর সাথে এই দুটি ফিচারের দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই। এই অসতর্কতার ফলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত কথাবার্তা কিংবা চারপাশের দৃশ্য গোপনে ধারণ করার একটি স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ধরনের ক্ষতিকর পরিস্থিতি এড়াতে স্মার্টফোনে থাকা প্রতিটি অ্যাপের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন ব্যবহারের পারমিশন নিয়মিত বিরতিতে খতিয়ে দেখা উচিত এবং কাজের সাথে সংগতিহীন মনে হলে সংশ্লিষ্ট অ্যাপগুলোর সেই অনুমতি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা প্রয়োজন।
আধুনিক প্রযুক্তির স্মার্টফোনগুলোতে এই গোপন নজরদারি সহজে শনাক্ত করার জন্য এখন বেশ কিছু চমৎকার ফিচার যুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো প্রাইভেসি ড্যাশবোর্ড। অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের বিল্ট-ইন ‘প্রাইভেসি ড্যাশবোর্ড’ এবং আইফোনের নিজস্ব ‘প্রাইভেসি সেটিংস’ ব্যবহার করে খুব সহজেই দেখে নেওয়া যায় যে অতি সম্প্রতি কোন অ্যাপটি ব্যবহারকারীর অবস্থান, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন কিংবা কন্টাক্ট লিস্টের মতো সংবেদনশীল ডেটা ব্যবহার করেছে। স্মার্টফোনের এই শক্তিশালী প্রাইভেসি টুলটি নিয়মিত ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবহারকারী তাঁর ফোনের ব্যাকগ্রাউন্ডে ঘটা সমস্ত কার্যক্রমের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেন এবং কোনো অ্যাপের অনৈতিক কার্যকলাপ ধরা পড়লে সাথে সাথে ব্যবস্থা নিতে পারেন।
সর্বোপরি, স্মার্টফোনের সুরক্ষাকে আরও এক ধাপ মজবুত করতে ফোনে জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় ও অব্যবহৃত অ্যাপগুলোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। অনেক সময় কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য আমরা একটি অ্যাপ ইনস্টল করি, যা পরবর্তীতে আর কোনোদিন ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু দীর্ঘদিন ফোনে নিষ্ক্রিয়ভাবে পড়ে থাকা এই অ্যাপগুলো পূর্বে দেওয়া অনুমতির সুবিধা নিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে যেতে পারে। তাই স্মার্টফোনের মেমোরি খালি করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে অ্যাপগুলোর আর কোনো প্রয়োজন নেই, সেগুলো নিয়মিত ফোন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা বা আনইনস্টল করা উচিত। এই সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী অভ্যাসটি ডিজিটাল নজরদারির ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দিয়ে ব্যবহারকারীকে এক নিরাপদ স্মার্টফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা প্রদান করবে।