
ঘড়ির কাঁটা যতই রাত কিংবা ভোররাতের দিকে এগোচ্ছে, ক্রীড়াপ্রেমীদের চোখের ঘুম উধাও করে দিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর সব ফুটবলীয় লড়াই শুরু হচ্ছে টিভির পর্দায়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরে ভিন্ন ভিন্ন টাইম জোনে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্বভাবতই বাংলাদেশে খেলা সম্প্রচারের সময়ে বড় রকমের তারতম্য ঘটছে। এই তুমুল আকর্ষণের কারণে ফুটবলপ্রেমীদের এক বড় অংশ গভীর রাত বা ভোররাতে জেগে খেলা দেখছেন, যার ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ঘুমের তীব্র ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তবে একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবনে খেলাধুলার মতো নিখাদ আনন্দ যেমন মানসিক তৃপ্তি ও হ্যাপি হরমোনের দারুণ এক উৎস, ঠিক তেমনি সুস্থ থাকার জন্য শরীরের প্রয়োজনীয় ঘুমের সাথে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মতলেবুর রহমান ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও জীবন রক্ষাকারী পরামর্শ দিয়েছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, বয়সভেদে মানুষের ঘুমের চাহিদার একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাপ রয়েছে যা সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তবে কম বয়সীদের ক্ষেত্রে এই চাহিদার পরিমাণ আরও অনেক বেশি। বিশেষ করে বাড়ির শিশু ও কিশোরদের মধ্যে খেলা দেখার তুমুল উৎসাহ থাকলেও তাদের শারীরিক বৃদ্ধির জন্য দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানো অত্যন্ত জরুরি। একইভাবে ৬ থেকে ১২ বছর বয়সীদের জন্য দৈনিক ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা এবং ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য রোজ ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা দরকার। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন যে, বয়স অনুযায়ী এই পর্যাপ্ত ঘুমের ঘাটতি হলে মানবদেহে নানান ধরনের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে দিনের বেলা ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব লেগে থাকে, যা রাস্তা পারাপার কিংবা গাড়ি চালানোর মতো স্পর্শকাতর কাজে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর পাশাপাশি মানসিক অস্থিরতা, কাজে মনোযোগের অভাব, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং কোনো কিছু শেখার বা পূর্বের দক্ষ কাজ সম্পন্ন করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো মানসিক বিপর্যয় দেখা দেয়, যা ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া দীর্ঘদিনের ঘুমের এই ঘাটতি পরোক্ষভাবে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো মরণব্যাধির কারণ হতে পারে এবং রাত জাগার অভ্যাসের কারণে মানুষের মাঝে অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত স্ন্যাকস খাওয়ার প্রবণতাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
খেলা দেখার আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি কীভাবে ঘুমের এই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া যায়, তার চমৎকার কিছু কৌশল বাতলে দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে রাখতে হবে যে বিশ্বকাপের সব ম্যাচই যে সরাসরি লাইভ দেখতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাই বুদ্ধিমত্তার সাথে শুধু প্রিয় দল এবং হাই ভোল্টেজ বা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর তালিকা আগেভাগেই ঠিক করে রাখা উচিত, যাতে বাকি সময়টাতে শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া যায়। খেলার সময়সূচি অনুযায়ী নিজের ঘুমের সময়কে কিছুটা সুবিধাজনকভাবে পুনর্বিন্যাস করে নেওয়া যেতে পারে, যেমন খেলা শুরুর আগে কিংবা পরে ঘুমিয়ে নেওয়া। এতে হয়তো একটানা ঘুম হবে না, তবুও দৈনিক ঘুমের মোট কোটা পূর্ণ করা সম্ভব হবে। এমনকি যদি কোনো কারণে বিছানায় শোয়ার পর তাৎক্ষণিক ঘুম নাও আসে, তবুও চোখ বুজে গা এলিয়ে বিশ্রাম নেওয়া জরুরি, যা শরীরকে দারুণ স্বস্তি দেবে। এছাড়া রাত জেগে খেলা দেখার সময় চিপস বা ভাজাপোড়ার বদলে ফলমূল বা বাদামের মতো স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া শরীরের জন্য মঙ্গলজনক।
বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে উত্তেজনা ও রোমাঞ্চের কারণে মানবদেহে অ্যাড্রেনালিন হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, যার ফলে টানটান উত্তেজনার খেলা শেষ হওয়া মাত্রই হুট করে ঘুমিয়ে পড়া বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যা সমাধানে চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, খেলা যতই চিত্তাকর্ষক হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত এটিকে একটি খেলা হিসেবেই দেখতে হবে এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ঘুমের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। খেলা শেষ হওয়া মাত্রই ঘরের সব আলো নিভিয়ে আরামদায়ক আবহাওয়া তৈরি করা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ম্যাচ শেষের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া, কমেন্ট করা কিংবা বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং বা ডিজিটাল স্ক্রিনে স্ক্রল করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে। কারণ এই ডিজিটাল স্ক্রিনের আলো এবং খেলার রেশ ধরে রাখা আলাপচারিতা উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়, যা স্বাভাবিক ঘুমকে দূরে ঠেলে দেয়। তাই খেলার যাবতীয় চুলচেরা বিশ্লেষণ ও বন্ধুদের সাথে আড্ডা জমিয়ে রাখুন পরবর্তী কোনো অবসর সময়ের জন্য এবং খেলা শেষ হওয়া মাত্রই ডিজিটাল ডিভাইস দূরে রেখে দ্রুত ঘুমের দেশে হারিয়ে যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।