
অতিরিক্ত মেদ ঝরিয়ে যারা একটি সুস্থ ও সুন্দর শরীরের স্বপ্ন দেখছেন, তাদের প্রাত্যহিক জীবনে ডিজিটাল ওয়েট মেশিন বা ওজন মাপার যন্ত্রটি এক অদ্ভুত ভূমিকা পালন করে। এটি কখনো পরম স্বস্তির উৎস, আবার কখনো বা মানসিক আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই খেয়াল করে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হন যে, সকালে ঘুম থেকে উঠে যে ওজনটি দেখা গেল, ঠিক রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সেই ওজনে এক থেকে দুই কেজির এক বিশাল তারতম্য ঘটে গেছে। ওজনের এই নাটকীয় হেরফের দেখে ডায়েট বা শরীরচর্চায় কোনো মস্ত বড় ভুল হচ্ছে ভেবে অনেকেই ভেঙে পড়েন, কেউ কেউ মাঝপথেই ছেড়ে দেন সুস্থ থাকার লড়াই। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মানবদেহের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে শরীরের ওজনের এই আকস্মিক পরিবর্তন অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা এবং এতে বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
দিনের বিভিন্ন ভাগে মানবদেহের ওজনের এই পরিবর্তনের পেছনে মূলত মানুষের খাদ্যতালিকাই প্রধান ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন আমরা যে পরিমাণ খাবার ও তরল গ্রহণ করি, তার নিজস্ব একটি নির্দিষ্ট ভর রয়েছে যা সাময়িকভাবে শরীরের মোট ওজনকে বাড়িয়ে দেয়। যতক্ষণ না শরীর সেই খাবারগুলোকে সম্পূর্ণ বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হজম করছে কিংবা বর্জ্য হিসেবে নিষ্কাশন করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ওজন পরিমাপক যন্ত্রে বাড়তি রিডিং দেখাবেই। এর পাশাপাশি আমাদের খাবারে থাকা লবণ বা সোডিয়াম এবং কার্বোহাইড্রেটের ভূমিকাও অনন্য। লবণের আধিক্য শরীরকে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে বাধ্য করে, আর মাত্র এক গ্রাম কার্বোহাইড্রেট শরীরের কোষে জমা হতে প্রায় তিন গ্রাম পানির সাহায্য নেয়। ফলে যেদিন বিরিয়ানি কিংবা নোনা ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাওয়া হয়, তার পরদিনই স্কেলে ওজনের পারদ অনেকটা ওপরের দিকে চড়ে যায়। আবার তীব্র ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রমের পর যখন শরীর থেকে প্রচুর ঘাম ঝরে যায়, তখন সাময়িকভাবে এক ধরনের মেকি ওজন হ্রাস লক্ষ্য করা যায়, যা মূলত পানি কমে যাওয়ার কারণে ঘটে এবং পুনরায় পানি পান করলেই শরীর চেনা ওজনে ফিরে আসে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, এতসব রিডিংয়ের ভিড়ে আসলে কোন ওজনটিকে সঠিক বলে ধরে নেওয়া হবে। প্রকৃতপক্ষে কোনো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের সংখ্যাই শরীরের প্রকৃত চর্বি বা পেশির চূড়ান্ত সত্য প্রকাশ করে না, কারণ ওজন সবসময় একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করতে ভালোবাসে। তবে শরীরের আসল ‘বেজলাইন’ বা প্রকৃত ওজন বোঝার জন্য বিজ্ঞানসম্মত একটি আদর্শ সময় রয়েছে, যা হলো প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এবং প্রাতঃকৃত্য বা টয়লেট সেরে সম্পূর্ণ খালি পেটে ওজন নেওয়া। দীর্ঘ রাতের ঘুমের পর পাকস্থলী একদম শূন্য থাকে এবং শরীর নতুন করে পানি বা তরল শোষণের সুযোগ পায় না বিধায় এই বিশেষ মুহূর্তের রিডিংটিকেই সবচেয়ে নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়।
ফিটনেস ধরে রাখার এই দীর্ঘযাত্রায় মানসিক চাপমুক্ত থাকতে কিছু নিয়মতান্ত্রিক অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন নিয়ম করে ওজন মেপে অযথা উদ্বেগ না বাড়িয়ে সপ্তাহের যেকোনো একটি নির্দিষ্ট দিন, যেমন প্রতি শনিবার সকালকে ওজন মাপার জন্য নির্ধারণ করার পরামর্শ দেন। পরিমাপের সময় প্রতিবার একই ডিজিটাল মেশিন ব্যবহার করা এবং শরীরে একদম হালকা পোশাক থাকা বাঞ্ছনীয়। সঠিক রিডিং পেতে হলে কার্পেট বা অসমতল জায়গার পরিবর্তে ঘরের একদম সমতল মেঝের ওপর যন্ত্রটি রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, ডিজিটাল মেশিনের সামান্য সংখ্যার হেরফেরে মন খারাপ না করে নিজের শারীরিক কর্মক্ষমতা ও ফিটনেসের ওপর নজর দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়া কিংবা আলমারির পুরোনো প্রিয় পোশাকগুলো শরীরে সুন্দরভাবে ফিট হওয়াটাই হোক সুস্থতার আসল ও চূড়ান্ত পরিমাপক।