
দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের আইনাঙ্গনে এখন জোর আলোচনা ও গুঞ্জন চলছে। বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় এই আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে কে আসছেন, তা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে আইনজীবী মহল পর্যন্ত চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হলে অ্যাটর্নি জেনারেলকে পদত্যাগ করতে হয়, আর এই পদত্যাগের পরই রাষ্ট্রপতি নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেবেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হওয়ার যোগ্য যেকোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ দিতে পারেন। একইসঙ্গে, অ্যাটর্নি জেনারেল রাষ্ট্রপতির সন্তোষ অনুযায়ী পদে বহাল থাকেন। বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান নির্বাচনমুখী হওয়ায় সরকার ইতোমধ্যে নতুন নিয়োগের বিষয়ে সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী এই প্রসঙ্গে বলেছেন যে, তফসিল ঘোষণা ও মনোনয়নপত্র কেনার পর বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল পদত্যাগ করলেই রাষ্ট্রপতি নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন।
নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমানে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একাধিক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। এই তালিকায় রয়েছেন মুহাম্মদ আব্দুল জব্বার ভুঁইয়া, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ অনীক আর হক। এদের মধ্যে ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ সুপ্রিম কোর্টে সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে সুপরিচিত এবং তিনি একাধিকবার ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ অনীক আর হক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সমন্বয়কদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভূমিকা রেখে আলোচনায় এসেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলদের মধ্য থেকেই পরবর্তী প্রধান আইন কর্মকর্তা আসতে পারেন।
তবে আলোচনার পরিধি কেবল অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী আইনজীবীর নাম জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। এদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত নাম হলেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, যিনি দুইবারের নির্বাচিত সম্পাদক (বিএনপি প্যানেল) এবং বর্তমানে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও বিএনপিপন্থি আইনজীবী হিসেবে ব্যারিস্টার এম. বদরুদ্দোজা বাদলের নামও রয়েছে, যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল রিটের অন্যতম আইনজীবী ছিলেন।
এছাড়া, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় আসামিপক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং সর্বশেষ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আইনজীবী হিসেবে পরিচিত ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুনও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন। সার্ভিস ম্যাটার সংক্রান্ত মামলায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করা ব্যারিস্টার সালাহউদ্দিন দোলন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী মামলায় সম্পৃক্ত থাকা শরীফ ভূঁইয়ার নামও আলোচনায় এসেছে। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও সুপ্রিম কোর্ট বারের পরিচিত মুখ অ্যাডভোকেট বিএম ইলিয়াস কচি এবং সাবেক বিচারপতি ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজী-এর নামও সম্ভাব্য অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
সবমিলিয়ে, দেশের আইনাঙ্গন এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। তবে কে হচ্ছেন দেশের পরবর্তী প্রধান আইন কর্মকর্তা—সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো আইনি মহল।