
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে এক অদৃশ্য কিন্তু প্রাণঘাতী শত্রুর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সাধারণ কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস নয়, এবারের আতঙ্কের নাম ‘ক্যান্ডিডা অরিস’ নামক এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক। সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই ছত্রাকটির দ্রুত বিস্তার এবং সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতিতে একে নির্মূল করতে না পারার ভয়াবহতা নিয়ে কঠোর সতর্কতা জারি করেছেন। ২০০৯ সালে প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ছত্রাকটি গত এক দশকে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৯টি রাজ্যে এর অস্তিত্ব মিলেছে। যা এক সময় বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হতো, তা এখন বৈশ্বিক মহামারীর মতো রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ক্যান্ডিডা অরিস নামক এই ছত্রাকটি মূলত মানুষের শরীরে আক্রমণ চালিয়ে রক্তপ্রবাহে মিশে যায়, যা পরবর্তীকালে জীবনঘাতী হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ছত্রাকটি এতটাই শক্তিশালী যে বর্তমানে বাজারে প্রচলিত প্রায় সব ধরনের অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে এটি প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে। এমনকি চিকিৎসার ইতিহাসে বিরল এমন কিছু ঘটনাও সামনে এসেছে, যেখানে অ্যান্টিফাঙ্গালের প্রধান চারটি শ্রেণীর সব ওষুধই এই ছত্রাক দমনে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য এটি যমদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ক্যান্ডিডা অরিস দ্বারা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যাদের ত্বক আক্রান্ত হয়, তাদের এক-তৃতীয়াংশই প্রাণ হারান। আর যদি এই ছত্রাক কোনোভাবে রক্তে ছড়িয়ে পড়ে, তবে মৃত্যুর হার ভয়াবহভাবে বেড়ে ৫০ শতাংশে গিয়ে ঠেকে।
গবেষকদের মতে, এই ছত্রাকের ক্রমবর্ধমান শক্তির পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত কারণ। সাধারণত ছত্রাক শীতল পরিবেশে জন্মালেও ক্যান্ডিডা অরিস উষ্ণ পরিবেশের সঙ্গে অবিশ্বাস্যভাবে মানিয়ে নিয়েছে। গত বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে ছত্রাকজনিত সংক্রমণে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। তবে ক্যান্ডিডা অরিসের বিশেষত্ব হলো এর ‘মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স’ ক্ষমতা, যা একে অন্যান্য সাধারণ ছত্রাকের তুলনায় বহুগুণ বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে। চিকিৎসকরা লক্ষ্য করেছেন যে, প্রথাগত পদ্ধতিতে এই ছত্রাক শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন, যার ফলে সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হওয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা রোগ নির্ণয়ের উন্নত প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়েছেন। গবেষক দলের মতে, কেবলমাত্র ওষুধ দিয়ে এই প্রাণঘাতী ছত্রাককে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; বরং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের রক্ষায় দ্রুত ভ্যাকসিন-ভিত্তিক পদ্ধতি এবং নতুন ধরনের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এছাড়া বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সংক্রমণের হার কমাতে আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। খুলনার প্রতিচ্ছবিকে দেওয়া তথ্যে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ এবং নতুন ওষুধ তৈরি করা না যায়, তবে ক্যান্ডিডা অরিস ভবিষ্যতে বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।