
একটি শিশুর ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় পৃথিবীর প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে বেঁচে থাকার লড়াই। নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কোমল ও সংবেদনশীল হওয়ায় এই লড়াইয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে প্রতিষেধক টিকা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পর থেকে নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে টিকা প্রদান করলে শিশুর শরীরে এমন এক সুরক্ষা বলয় তৈরি হয়, যা তাকে মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি থেকে আজীবন রক্ষা করতে পারে। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি দুই ধরনের টিকাদান ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয়। মূলত পোলিও, যক্ষ্মা, ধনুষ্টঙ্কার ও নিউমোনিয়ার মতো ঘাতক ব্যাধিগুলো থেকে শিশুকে বাঁচাতে সরকারিভাবে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই-এর আওতায় বিনামূল্যে অত্যন্ত জরুরি কিছু টিকা প্রদান করা হয়।
সরকারি টিকাদান কর্মসূচির মূল ভিত্তি হলো বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্ট এবং ওপিভি বা আইপিভি’র মতো টিকাগুলো। বিসিজি টিকা শিশুকে যক্ষ্মার হাত থেকে বাঁচায়, অন্যদিকে পেন্টাভ্যালেন্ট নামক সমন্বিত টিকাটি ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, হেপাটাইটিস বি এবং হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি-র মতো পাঁচটি জটিল রোগ প্রতিরোধ করে। এছাড়া পঙ্গুত্ব রোধে পোলিও টিকা এবং ফুসফুস ও মস্তিষ্কের সংক্রমণ ঠেকাতে পিসিভি টিকা দেওয়া হয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে। হাম ও রুবেলা প্রতিরোধের জন্য এমআর টিকা এবং জলাতঙ্ক নিরাময়ে র্যাবিস ভ্যাকসিনের সহজলভ্যতাও নিশ্চিত করেছে সরকার। এই টিকাগুলো গ্রহণ করার জন্য অভিভাবকরা নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিকে যোগাযোগ করতে পারেন, যেখানে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী কোনো খরচ ছাড়াই সেবা প্রদান করা হয়।
সরকারি এই বাধ্যতামূলক টিকার বাইরেও বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে বেশ কিছু বেসরকারি টিকা বাংলাদেশে প্রচলিত রয়েছে, যা শিশুকে অতিরিক্ত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা প্রদান করে। বিশেষ করে রোটাভাইরাস যা শিশুদের মারাত্মক ডায়রিয়া প্রতিরোধ করে এবং চিকেনপক্স বা জলবসন্তের জন্য ভারিসেলা টিকা এখন অনেক সচেতন অভিভাবক বেসরকারি হাসপাতাল থেকে গ্রহণ করছেন। এছাড়া জন্ডিস প্রতিরোধে হেপাটাইটিস এ, টাইফয়েড জ্বরের জন্য টিসিভি এবং সিজনাল ফ্লু বা হাঁপানির ঝুঁকি কমাতে ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। মেয়ে শিশুদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকা এবং কলেরার হাত থেকে বাঁচতে ইটিইসি টিকার গুরুত্বও অপরিসীম। যদিও এসব টিকা সংগ্রহ করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ খরচ বহন করতে হয়, তবুও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ঝুঁকির তুলনায় একে বিনিয়োগ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক সময়ে সঠিক ডোজ সম্পন্ন করা। জন্মের পর প্রথম ছয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে শিশুর ১৫-১৬ বছর বয়স পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে ধাপে বুস্টার ডোজসহ এসব টিকা দেওয়া হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদের মতে, কোনো কারণে টিকার নির্দিষ্ট তারিখ পেরিয়ে গেলে বিচলিত না হয়ে দ্রুততম সময়ে তা দিয়ে দেওয়া উচিত, কারণ আংশিক ডোজ শিশুর পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। অনেকে টিকা দেওয়ার পর শিশুর হালকা জ্বর বা ব্যথার ভয়ে পিছিয়ে আসেন, যা আসলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সক্রিয় হওয়ার একটি স্বাভাবিক লক্ষণ মাত্র। মনে রাখতে হবে, একটি শিশুকে টিকা দেওয়া মানে কেবল তাকে একাকী সুরক্ষিত করা নয়, বরং পুরো সমাজে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গণ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তাই শিশুর টিকাদান কেবল পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি সুস্থ ও নিরাপদ প্রজন্ম গঠনের সামাজিক দায়িত্বও বটে।