
খুলনা শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে ফুলতলা উপজেলার নিভৃতপল্লী দক্ষিণডিহি আজ বিশ্বজুড়ে রবীন্দ্র অনুরাগী ও পর্যটকদের কাছে এক আবেগের নাম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই গ্রামটি কেবল একটি জনপদ নয়, বরং কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য এক সম্পর্কের সেতুবন্ধন। এই গ্রামেই জন্মেছিলেন কবির মা সারদা সুন্দরী দেবী, কাকীমা ত্রিপুরা সুন্দরী দেবী এবং জীবনসঙ্গিনী মৃণালিনী দেবী। কবির পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস খুলনার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগে হলেও, দক্ষিণডিহির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল নাড়ির। যৌবনে মায়ের সঙ্গে বহুবার এই মামাবাড়িতে এসেছেন তিনি। ঐতিহাসিক এই দক্ষিণডিহি গ্রামেই ছিল কবির শ্বশুর বেনী মাধব রায় চৌধুরীর জমিদারবাড়ি, যা বর্তমানে ‘রবীন্দ্র কমপ্লেক্স’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
সবুজ বৃক্ষরাজিতে ঘেরা এই কমপ্লেক্সের প্রবেশপথেই দুই পাশে কবিগুরুর আবক্ষ ভাস্কর্য দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়। স্থাপত্যশৈলীর বিচারে দোতলা এই ভবনটি জমিদার রায় চৌধুরী পরিবারের ঐশ্বর্য ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। ঐতিহাসিক এই ভবনটির নিচতলায় চারটি এবং ওপরতলায় দুটি প্রশস্ত কক্ষ রয়েছে, যার চারদিকের বারান্দা ও ছিমছাম চিলেকোঠা স্থাপত্যে এক অনন্য শোভা দান করেছে। ভবনের নিচতলায় রয়েছে কবির লেখা বই, পাঠকক্ষ, পাণ্ডুলিপি, হস্তলিপি ও দুর্লভ সব পেইন্টিং। দেয়ালে সুসজ্জিত বোর্ডে বিশ্বকবির জীবনদর্শন ও তথ্যচিত্রের পাশাপাশি তার সহধর্মিণী মৃণালিনী দেবীর স্মৃতিচিহ্নগুলো সযত্নে রক্ষিত আছে। যদিও জনশ্রুতি রয়েছে যে পীরালী বংশের আচারের কারণে রবীন্দ্রনাথ বর সেজে এই বাড়িতে আসেননি এবং কলকাতার জোড়াসাঁকোতেই তাদের পরিণয় সম্পন্ন হয়েছিল, তবুও এই বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণা কবির ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করে। পরিণয়লগ্নে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ২২ বছরের এক প্রদীপ্ত যুবক, অন্যদিকে তাঁর জীবনসঙ্গিনী মৃণালিনী দেবী (তদানীন্তন ভবতারিনী) ছিলেন মাত্র ১১ বছরের এক চপল কিশোরী। লোকমুখে প্রচলিত আছে, ১৮৮৩ সালে বিয়ের আগে এখানে টিনের ঘর থাকলেও বিয়ের পরবর্তী সময়ে বর্তমানে দৃশ্যমান এই শৈল্পিক দোতলা ভবনটি নির্মিত হয়। যদিও এর নির্মাতা হিসেবে কবির নাম শোনা যায়, তবে এর কোনো অকাট্য দালিলিক প্রমাণ মেলেনি।
দীর্ঘদিন অবৈধ দখলে থাকার পর ১৯৯৫ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভবনটি সংস্কারের মাধ্যমে মুক্ত করা হয় এবং ১৯৯৯ সালে একে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে ‘দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমানে নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্যের বিনিময়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এখানে ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে তিন দশক পার হয়ে গেলেও শান্তিনিকেতনের আদলে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তার সিংহভাগই এখনো কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। কবির শ্বশুর ও শ্যালক নগেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীর মালিকানাধীন আট একরের বেশি সুবিশাল এই চত্বরে একটি সমৃদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র, আধুনিক সংগ্রহশালা ও পর্যটনবান্ধব আবাসন ব্যবস্থা গড়ার দাবি দীর্ঘদিনের।
বর্তমান খুলনা জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলামের মতে, কমপ্লেক্সটির সার্বিক উন্নয়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানামুখী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। দক্ষিণডিহির এই রবীন্দ্র কমপ্লেক্স কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি জীবন্ত স্মারক। এখানে মৃণালিনী মঞ্চ নির্মাণসহ কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি সংহতি প্রয়োজন। যদি যথাযথ সংরক্ষণ ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা যায়, তবে এই দক্ষিণডিহিই হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণবঙ্গের সংস্কৃতিচর্চা ও পর্যটন শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।