
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খরস্রোতা গ্যাংরাইল ও ভদ্রা নদীর মোহনায় অবস্থিত এক বদ্বীপ সদৃশ জনপদ বাঁশতলা। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নের এই গ্রামটি এখন মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার পথে। গত কয়েক বছরে নদী ভাঙনের ভয়াবহতায় পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন এই গ্রামের অন্তত ২৫টি পরিবার। এক সময়ের সমৃদ্ধ ফসলি জমি আজ নদীর পেটে, আর মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে এসব পরিবার এখন সরকারি খাস জমিতে বা অন্যের আশ্রয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দিনাতিপাত করছেন। ছয় বছর আগে শুরু হওয়া প্রবল ভাঙনে প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের বাঁশতলা গ্রামের সিংহভাগই এখন গ্যাংরাইল নদীর গর্ভে। পার্শ্ববর্তী লতাবুনিয়া গ্রামের অবস্থাও তথৈবচ, সেখানেও প্রায় ১০০ বিঘা জমি নদী গ্রাস করেছে। দুই গ্রাম মিলিয়ে প্রায় ২০০ বিঘা সম্পত্তি হারিয়ে দিশেহারা স্থানীয় বাসিন্দারা এখন এক মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন।
সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই জনপদে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকো। শুধু আবাসন সংকট নয়, এই এলাকার মানুষের জন্য এখন সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপেয় পানির অভাব। গ্রামে কোনো গভীর নলকূপ না থাকায় নারীদের মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে নদী পার হয়ে অন্য গ্রাম থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। বিষ্ণুপদ গাইন, অসীম গাইন ও সুপর্ণা গাইনের মতো অনেকেই তাদের পৈতৃক ভিটে হারিয়ে আজ নিঃস্ব। তারা জানান, ২০০০ সাল থেকে ভাঙন শুরু হলেও গত কয়েক বছরে তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতি বছর বাঁধ মেরামতের নামে অর্থ ব্যয় করলেও কোনো স্থায়ী বা টেকসই সমাধান আজ পর্যন্ত হয়নি। ফলে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই গ্রামবাসীর মধ্যে নতুন করে জমি ও ঘর হারানোর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাঁশতলা গ্রামের অনেক পরিবার পার্শ্ববর্তী শিবনগর গ্রামে জেগে ওঠা চরে চাষাবাদ করে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। নিজেদের হারানো জমি ফিরে পেতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন সচীন্দ্রনাথ গাইনের মতো ভুক্তভোগীরা, যার মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। সাহস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোল্যা মাহাবুবুর রহমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সাময়িকভাবে কিছু সংস্কার কাজ করা হলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এই জনপদকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। তিনি ইতিমধ্যে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করেছেন এবং গোলাইমারী এলাকার আদলে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহের একটি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই নদী রক্ষা বাঁধ নির্মিত না হলে অদূর ভবিষ্যতে এই দুটি গ্রাম পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠছে।