
ভারতের আসাম রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এক ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র ফুটে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, সুপরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটারদের ‘মৃত’ অথবা ‘এলাকা ত্যাগকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। নগাঁও ও লখিমপুরসহ বেশ কিছু জেলায় জীবিত ব্যক্তিদের নামেও সরকারি নোটিশ পাঠিয়ে বলা হচ্ছে যে, তাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আপত্তি জানানো হয়েছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন সরকারের অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বর্ষীয়ান আইনজীবী এবং কলেজ শিক্ষকও। নগাঁও জেলার বাসিন্দা হাফিজুদ্দিন আহমেদ এবং ৮০ বছর বয়সী শয্যাশায়ী আইনজীবী আজিরুদ্দিন আহমেদের মতো অনেক নাগরিকই সশরীরে উপস্থিত হয়ে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
এই রহস্যজনক গণ-আপত্তির নেপথ্যে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট পোলিং বুথের অন্তত ৬৪ জন ভোটারের বিরুদ্ধে বিশাল রায় নামের একজন ব্যক্তি একাই আপত্তি জানিয়েছেন। বিস্ময়করভাবে এই অভিযোগের তালিকায় ওই বুথের দায়িত্বরত সরকারি কর্মকর্তা বা বিএলও এবং তার স্ত্রীর নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ধিং কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবদুল সালামের মতো অনেকে ভ্রমণে থাকাকালীন এমন নোটিশ পেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সশরীরে হাজির হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের বিধিবিধান মেনে যারা ফর্ম-৭ পূরণ করে এই গণ-আপত্তি তুলেছেন, তাদের পরিচয় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এখন জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে নগাঁও জেলার জেলা প্রশাসক দেবাশীষ শর্মা আপাতত শুনানি স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে যে, নগাঁও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা হলেও হিন্দু ভোটারদের বিরুদ্ধেও কিছু অভিযোগ এসেছে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর অভিযোগ করার অপরাধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দোষী সাব্যস্ত হলে অভিযোগকারীর এক বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রয়েছে। বর্তমানে আসামজুড়ে প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার মৃত এবং ৫ লাখ ২৩ হাজার এলাকা ত্যাগকারী ভোটারকে শনাক্ত করার যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে, তাকে ঘিরে এই জালিয়াতি মূল প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সকল অভিযোগ নিষ্পত্তির পর ১০ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। সঠিক নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা আসামের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে এক কালো ছায়া হিসেবে দেখা দিয়েছে।