
ভারতের সরকারি শিক্ষা কারিকুলাম থেকে সুলতানি ও মুঘল আমলের ইতিহাস বাদ দেওয়ার সাম্প্রতিক উদ্যোগকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন বিশ্বখ্যাত প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার। এই সিদ্ধান্তকে ‘ননসেন্স’ বা সম্পূর্ণ অর্থহীন অভিহিত করে তিনি বলেন, ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাপ্রবাহ নয় যে একে নিজের ইচ্ছেমতো টুকরো টুকরো করে উপস্থাপন করা যাবে। কেরালা সাহিত্য উৎসবে অনলাইনে যুক্ত হয়ে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ইতিহাস হলো মানব সভ্যতার সংস্কৃতি, আচরণ ও চিন্তার একটি অবিচ্ছিন্ন বিবর্তন। ফলে কোনো নির্দিষ্ট রাজবংশ বা সময়কালকে পাঠ্যপুস্তক থেকে মুছে ফেলা মানে হলো ইতিহাসের সেই স্বাভাবিক ধারাবাহিকতাকে ধ্বংস করে দেওয়া, যা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসকেই অর্থহীন ও বিকৃত করে তোলে।
প্রবীণ এই ইতিহাসবিদের এমন মন্তব্য এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে সামনে এসেছে, যখন ভারতের জাতীয় শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পরিষদ (এনসিইআরটি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য সপ্তম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তক থেকে দিল্লি সুলতানি ও মুঘল সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো সরিয়ে নিয়েছে। রোমিলা থাপার তার বক্তব্যে সতর্ক করে বলেন যে, রাজনৈতিক বা আদর্শিক কারণে যদি একে একে রাজবংশ কিংবা বিশেষ সময়কালগুলো ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া হতে থাকে, তবে শিক্ষার্থীরা সত্য ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানার্জন থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদ্যমান জ্ঞানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পরিবেশ তৈরি করা, অথচ ইতিহাসকে খণ্ডিত করার মাধ্যমে সেই কেন্দ্রীয় ভূমিকাকেই আজ ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে।
পঁচিশটিরও বেশি কালজয়ী বইয়ের লেখক রোমিলা থাপার কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসের সীমাবদ্ধতায় আটকে না থেকে সামাজিক বিবর্তনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া তথাকথিত ইতিহাসচর্চার উত্থান এবং নারীবাদী ইতিহাসের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করেন। তার মতে, একটি জাতির শেকড় বুঝতে হলে তার ইতিহাসের প্রতিটি ধাপকে নির্মোহভাবে অধ্যয়ন করা জরুরি। ইতিহাসের পাতা থেকে প্রভাবশালী কোনো অধ্যায় মুছে ফেলে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করার এই চেষ্টা অ্যাকাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে তিনি মনে করেন। তার এই বলিষ্ঠ অবস্থান এখন ভারতের শিক্ষামহলসহ বিশ্বজুড়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।