
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দায়িত্ব ছাড়ার পর এসব অভিযোগ নিয়ে একাধিক লিখিত আবেদন জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে যাচাই-বাছাই শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগে শুধু সাবেক উপদেষ্টাদেরই নয়, তাদের সুপারিশে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয় উঠে এসেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনের সময় জনগণ যে নৈতিকতা ও জবাবদিহির প্রত্যাশা করেছিল, বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র সামনে এসেছে।
জানা গেছে, মানি লন্ডারিং ও সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) অন্তত চারজন সাবেক উপদেষ্টা ও একজন বিশেষ সহকারীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ফাওজুল কবির খান, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরী। দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের বিবরণ ও সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রমের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে ব্যয় বৃদ্ধি, অযৌক্তিক প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া নিজের নির্বাচনী এলাকায় প্রকল্প অনুমোদন ও বাজেট বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে তার একান্ত সহকারী (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের চাপ বাড়ায় দায়িত্বে থাকাকালেই তাকে বরখাস্ত করা হয়। বর্তমানে তার আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎস নিয়েও তদন্ত চলছে। এছাড়া মোয়াজ্জেম হোসেনের গাড়িচালকের ভাইয়ের আয়কর তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে তিনি প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা আয় দেখিয়েছেন, যা তার পেশা ও আয় উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকার একটি সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক এজাজের বিরুদ্ধেও তহবিল তছরুফসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আসিফ মাহমুদ সুপারিশ করেছিলেন। এ বিষয়ে দুদক ও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেক ছাত্র উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তার সাবেক একান্ত সচিব আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রভাব খাটিয়ে নিজের স্ত্রীর মাধ্যমে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করেছেন এবং সেখান থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করার পর একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধেও একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে।
শুধু উপদেষ্টারাই নন, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এবং সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সুশাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোনো অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। তিনি বলেন, “যদি প্রাথমিকভাবে দুর্নীতির তথ্য পাওয়া যায় এবং তা আমলযোগ্য হয়, তাহলে অবশ্যই তদন্ত করতে হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযোগের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুদক জানিয়েছে, অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে যাচাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।