
মানব সভ্যতার মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক অনন্য মাইলফলক। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর মহাকাশে পৃথিবীর বুক থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে পৌঁছানোর নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। বাংলাদেশ সময় গত সোমবার (৬ এপ্রিল) মধ্যরাতে তারা এই অভাবনীয় কীর্তি স্থাপন করেন, যা এর আগে কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়নি। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এই ঐতিহাসিক মিশনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অভিজ্ঞ নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, আর তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডীয় নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। তাঁদের এই সফল অগ্রযাত্রা মহাকাশ বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
অভিযানের এই বিশেষ মুহূর্তে নভোচারীরা যখন পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রম করছিলেন, তখন প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য কন্ট্রোল রুমের সাথে তাঁদের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চাঁদের দূরবর্তী অংশের আড়ালে চলে যাওয়ায় এই সাময়িক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলেও নভোচারীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পুনরায় সংযোগ স্থাপিত হওয়ার পর জানা যায়, যোগাযোগহীন ওই সময়টুকুতে তারা হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না, বরং চাঁদের অদেখা অংশের বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এই অসামান্য অর্জনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মহাকাশচারীদের সাথে সরাসরি কথা বলেন এবং তাঁদের অভিনন্দন জানান। পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাইলে নভোচারী ভিক্টর গ্লোভার জানান, সেই নিস্তব্ধ মুহূর্তে তিনি প্রার্থনা করেছিলেন, তবে একইসাথে তাঁদের ওপর অর্পিত বৈজ্ঞানিক দায়িত্বগুলোও কঠোর পরিশ্রমের সাথে পালন করেছেন।
ঐতিহাসিক এই রেকর্ডের আগে পৃথিবী থেকে মানুষের সবচেয়ে দূরে যাওয়ার কৃতিত্বটি ছিল ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ মিশনের নভোচারীদের দখলে। সে সময় তাঁরা পৃথিবী থেকে প্রায় চার লাখ ১৭১ কিলোমিটার বা দুই লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর আর্টেমিস-২ মিশন সেই পুরোনো রেকর্ড ভেঙে দিয়ে মহাকাশ গবেষণায় নতুন মানদণ্ড স্থাপন করল। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মিশনটি কেবল একটি রেকর্ড নয়, বরং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহসহ মহাকাশের আরও গভীরে মানুষের বসতি স্থাপনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমানে চার নভোচারীই সুস্থ আছেন এবং তাঁদের সংগৃহীত তথ্যগুলো মহাকাশ গবেষণায় নতুন প্রাণসঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।