
বর্তমান যুগে আধুনিক জীবনযাত্রার এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন। ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় এই ডিভাইসগুলোতে সাধারণত একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিল্ট-ইন থাকলেও সাইবার অপরাধীদের নিত্যনতুন ও চতুর কৌশলের কারণে ঝুঁকি কোনোভাবেই এড়ানো যাচ্ছে না। ব্যবহারকারীরা প্রতিনিয়ত ম্যালওয়্যার, স্পাইওয়্যার এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যারের মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাহ্যিকভাবে অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসগুলো সুরক্ষিত মনে হলেও আপনার অজান্তেই ফোনটি হ্যাক বা সংক্রমিত হয়েছে কিনা, তা বুঝতে সবসময় সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ এই ক্ষতিকর ম্যালওয়্যারগুলো শুধু ফোনের বাহ্যিক কার্যক্ষমতাই কমিয়ে দেয় না, বরং ডিভাইসে থাকা অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্য, সংবেদনশীল পাসওয়ার্ড এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের গোপন বিবরণও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। তাই স্মার্টফোন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা বুঝতে প্রধান ৪টি লক্ষণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
ডিভাইস ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রথম ও অন্যতম সাধারণ লক্ষণ হলো ফোনের আচমকা অস্বাভাবিক আচরণ। যদি আপনার স্মার্টফোনটি আপনার সম্পূর্ণ অজান্তেই নিজে নিজে টেক্সট মেসেজ পাঠাতে শুরু করে, অপরিচিত কাউকে কল দেয় কিংবা হুটহাট কোনো অ্যাপ নিজে থেকেই খুলে যায়, তবে বুঝতে হবে ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো ক্ষতিকর সফটওয়্যার সক্রিয় রয়েছে। এর পাশাপাশি স্ক্রিনে হঠাৎ পপআপ বিজ্ঞাপন ভেসে ওঠা কিংবা ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো অপরিচিত অ্যাপ ইনস্টল হয়ে যাওয়াও ম্যালওয়্যার সংক্রমণের স্পষ্ট ইঙ্গিত। দ্বিতীয় লক্ষণটি হলো অনলাইন অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশ বা সন্দেহজনক ক্রিয়াকলাপ। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল বা ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে কোনো সন্দেহজনক পরিবর্তন দেখা দিলে বুঝতে হবে লগইন তথ্য চুরি হয়েছে। ব্যবহারকারীর অজান্তেই পাসওয়ার্ড পরিবর্তন হয়ে যাওয়া বা অপরিচিত কোনো স্থান থেকে লগইন অ্যালার্ট আসার পেছনেও ম্যালওয়্যারের হাত থাকে।
তৃতীয়ত, মোবাইল ডাটা বা ইন্টারনেটের ব্যবহার হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াও একটি বড় সতর্কবার্তা। ফোনের ক্ষতিকর অ্যাপগুলো সাধারণত ব্যাকগ্রাউন্ডে লুকিয়ে থেকে বাইরের সার্ভারের সঙ্গে অনবরত যোগাযোগ রক্ষা করে এবং ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য বাইরে আপলোড করতে থাকে, যার ফলে অজান্তেই প্রচুর ডাটা খরচ হয় এবং ফোনের মাসিক বিল আকাশচুম্বী হয়ে যায়। চতুর্থ লক্ষণ হিসেবে দ্রুত ব্যাটারি শেষ হওয়া এবং ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারি কোনো কাজ বা গেম খেলা ছাড়াই যদি অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ব্যাটারি স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত শেষ হতে থাকে কিংবা ফোন প্রতিনিয়ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তবে ব্যাকগ্রাউন্ডে ম্যালওয়্যার চলার তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও পুরনো হার্ডওয়্যারের কারণেও এমনটা ঘটতে পারে, তবে নিয়মিত এই সমস্যা হওয়া মানে কোনো ক্ষতিকর অ্যাপ ফোনের প্রসেসর ও র্যাম অনবরত ব্যবহার করে চলেছে।
আপনার অ্যান্ড্রয়েড ফোনটি ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ হলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে কিছু প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, ফোনটিকে ‘সেফ মোড’-এ রিস্টার্ট করা উচিত, যা সব থার্ড-পার্টি অ্যাপ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়ে ক্ষতিকর অ্যাপ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এরপর সম্প্রতি ইনস্টল করা বা সন্দেহজনক মনে হওয়া অ্যাপগুলো দ্রুত আনইনস্টল করে দেওয়া জরুরি। একই সাথে ফোনের অ্যাপগুলো কী কী তথ্য ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে রেখেছে তা নিয়মিত রিভিউ করে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ পারমিশন বা অ্যাক্সেস বন্ধ করে দেওয়া উচিত। সুরক্ষার স্বার্থে গুগলের ‘অ্যাডভান্স প্রোটেকশন’ ফিচারগুলো সবসময় চালু রাখা এবং গুগল প্লে স্টোর ছাড়া অন্য কোনো অপরিচিত বা অনিরাপদ ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা আবশ্যক।
ডিভাইসকে নিরাপদ রাখতে সর্বদা অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম এবং ব্যবহৃত সব অ্যাপস আপ-টু-ডেট রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইমেইল, মেসেজ বা ওয়েবসাইটে আসা যেকোনো সন্দেহজনক ও প্রলোভন দেখানো লিংকে ক্লিক করা এড়িয়ে চলতে হবে এবং অনলাইন অ্যাকাউন্টগুলোর জন্য সবসময় জটিল ও অনন্য শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা উচিত। তবে এত কিছুর পরেও যদি আপনি নিশ্চিত হন যে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য ইতিমধ্যে চুরি হয়ে গেছে, তবে আর দেরি না করে অবিলম্বে আপনার মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। একই সাথে সমস্ত ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড দ্রুত পরিবর্তন করে ফেলা এবং আর্থিক নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পুরো বিষয়টি দ্রুত অবহিত করা কর্তব্য।