
মাথার ওপর নিশ্চল ফুটবল, অথচ দুই হাত হ্যান্ডেলে রেখে প্যাডেল ঘুরিয়ে এগিয়ে চলছেন এক স্বপ্নবাজ মানুষ। মাগুরার শালিখা উপজেলার শতখালী ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের আব্দুল হালিম আবারও প্রমাণ করলেন যে, একাগ্রতা আর শ্রম থাকলে অসম্ভবকেও জয় করা সম্ভব। দীর্ঘ ২০ দশমিক ২০ কিলোমিটার (১২ দশমিক ৫৫ মাইল) পথ মাথায় ফুটবল ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রেখে বাইসাইকেল চালিয়ে তিনি চতুর্থবারের মতো গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম খোদাই করেছেন। গত ২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মাগুরা ইনডোর স্টেডিয়ামে টানা ২ ঘণ্টা ১৯ মিনিট সাইকেল চালিয়ে তিনি এই অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করেন। সম্প্রতি গিনেস কর্তৃপক্ষ সকল তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে এই বিশ্ব রেকর্ডের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছে, যা বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় যোগ করল।
আব্দুল হালিমের এই যাত্রা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তিন দশকেরও বেশি সময়ের নিরলস সাধনার ফল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় একজন গোলকিপারের বল নিয়ন্ত্রণের কৌশল দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। সেই শুরু, এরপর দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে তিনি ফুটবলকে নিজের শরীরের অংশ বানিয়ে নিয়েছেন। ২০১১ সালে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ১৫ দশমিক ২ কিলোমিটার পথ হেঁটে প্রথমবার গিনেস বুকে নাম তোলেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালে রোলার স্কেটিং এবং ২০১৭ সালে সাইকেল চালনায় আরও দুটি রেকর্ড নিজের করে নেন। এবার নিজের আগের রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছালেন ৪৯ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকর। বর্তমানে ‘দ্য গ্রেটেস্ট ডিস্ট্যান্স ট্রাভেলড অন এ বাইসাইকেল ব্যালান্সিং এ ফুটবল অন দ্য হেড’ ক্যাটাগরিতে বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটটি তারই মাথায় শোভা পাচ্ছে।
১৯৭৫ সালে জন্ম নেওয়া আব্দুল হালিম শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিলেন প্রবল অনুরাগী। স্থানীয় ফুটবল দলে খেলার পাশাপাশি তিনি রপ্ত করেন ফুটবলের অর্ধশতাধিক চিত্তাকর্ষক কৌশল। একসময় জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে দেশজুড়ে পরিচিতি পান তিনি। গ্রামের মেলা থেকে শুরু করে জাতীয় দিবস—সবখানেই তার ফুটবল কসরত ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ফুটবল মাথায় নিয়ে গাছে ওঠা কিংবা পুকুরে গোসল করার মতো অবিশ্বাস্য সব নৈপুণ্য দেখিয়ে তিনি জয় করেছেন হাজারো মানুষের হৃদয়। তবে এই বিশ্বজয়ের নেপথ্যে রয়েছে সীমাহীন দারিদ্র্য আর সংগ্রামের গল্প। অন্য কোনো পেশায় না গিয়ে ফুটবল কসরতকেই জীবনের ধ্যান-জ্ঞান করায় আর্থিক টানাপোড়েন সবসময়ই তার নিত্যসঙ্গী। এবারের রেকর্ডটি গড়তে তাকে কোনো পৃষ্ঠপোষক ছাড়াই নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে অসাধ্য সাধন করতে হয়েছে।
বিদেশের মাটিতে দেশের নাম উজ্জ্বল করলেও আব্দুল হালিমের মনে রয়ে গেছে এক বুক অভিমান। দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনলেও ব্যক্তিগত জীবনে আর্থিক সচ্ছলতা কিংবা রাষ্ট্রীয় বড় কোনো সহযোগিতা আজও তার দুয়ারে পৌঁছায়নি। তিনি চান তার এই বিরল কৌশলগুলো নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে, যাতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হয় এবং আরও নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়। মাগুরা জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থা তার এই অর্জনে গর্বিত এবং তারা তার পাশে থাকার আশ্বাস দিলেও ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘমেয়াদী পৃষ্ঠপোষকতা তার আগামীর পথচলার জন্য অত্যন্ত জরুরি। আব্দুল হালিমের মতো গুণীজনরা কেবল আমাদের অহংকারই নন, বরং তারা প্রমাণ করেন যে প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে সম্পদহীনতা কোনো বাধা হতে পারে না। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ফুটবল জাদুকর হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক বিশ্ব রেকর্ড উপহার দিয়ে দেশের মানচিত্রকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।