
ইতিহাসের পাতায় আরএমএস টাইটানিক এক অপরাজিত মহিমা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল মধ্যরাতে উত্তর আটলান্টিকের হিমশীতল স্রোতে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের তৎকালীন বৃহত্তম ও নিরাপদ বলে দাবি করা এই জাহাজটিকে ডুবিয়ে দিয়েছিল যে বিশালাকার হিমশৈল, সেটির উৎপত্তি ও যাত্রাপথ ছিল এক বিস্ময়কর কাকতালীয় ঘটনা। স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আমেরিকান হিস্ট্রির গবেষকদের মতে, যে সময় উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে টাইটানিক নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছিল, ঠিক সেই ১৯০৯ সালেই গ্রিনল্যান্ডের একটি বিশাল হিমবাহ থেকে একটি বরফখণ্ড ভেঙে সাগরে পড়েছিল। প্রকৃতির সেই অবিচ্ছেদ্য অংশটিই ছিল ভবিষ্যতের সেই ঘাতক হিমশৈল, যা প্রায় তিন বছর ধরে আটলান্টিকের বুকে ভেসে বেরিয়েছিল।
১৯০৯ সালে সাগরে ভাসতে শুরু করার পর ১৯১০ সালের দিকে হিমশৈলটি উত্তর মেরুর কাছাকাছি চলে যায়। সেখান থেকে ল্যাব্রাডর কারেন্ট নামক অত্যন্ত শীতল এক সমুদ্রস্রোতের কবলে পড়ে এটি দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে থাকে। সাধারণত সমুদ্রের নোনা জলে অধিকাংশ হিমশৈল এক থেকে দুই বছরের মধ্যে গলে নিঃশেষ হয়ে গেলেও এই বিশেষ বরফখণ্ডটি প্রায় তিন বছর টিকে ছিল। শেষ পর্যন্ত এটি আটলান্টিকের ৪১ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে এসে পৌঁছায়, যা ছিল টাইটানিকের নির্ধারিত যাত্রাপথের ঠিক মাঝখানে। গবেষক ড্যানিয়েল স্টোন এক পর্যালোচনায় জানিয়েছেন যে, ঘাতক এই বরফখণ্ডটি তখন তার জীবনের একেবারে অন্তিম পর্যায়ে ছিল। সমুদ্রের উত্তাপে গলে এটি এতটাই ছোট হয়ে আসছিল যে, জাহাজটির সঙ্গে সংঘর্ষের মাত্র এক থেকে দুই সপ্তাহ পরেই এটি সম্পূর্ণ মিলিয়ে যেত।
দুর্ঘটনার সেই রাতে টাইটানিক ২০ দশমিক ৫ নট গতিবেগে ছুটে চলছিল। নকশাকারীদের প্রবল বিশ্বাস ছিল যে পানিরোধক প্রকোষ্ঠগুলো জাহাজটিকে যেকোনো পরিস্থিতিতে ভাসিয়ে রাখবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, হিমশৈলের আঘাতে জাহাজের ডান পাশের নিচের অংশে থাকা পাঁচটি প্রকোষ্ঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রকৌশলগত হিসাব অনুযায়ী, কেবল একটি বা দুটি প্রকোষ্ঠ ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাহাজটি ভেসে থাকার সম্ভাবনা ছিল। তবে পাঁচটি প্রকোষ্ঠে একযোগে পানি ঢুকে পড়ায় জাহাজের সামনের অংশ ভারী হয়ে দ্রুত সমুদ্রতলে নিমজ্জিত হতে থাকে। উদ্ধারকারী জাহাজ কার্পেথিয়া যখন সেখানে পৌঁছায়, তখন কয়েক হাজার মানুষের আর্তনাদ শেষে চারদিকে কেবল হিমশীতল নীরবতাই বিরাজ করছিল।
টাইটানিকের সেই ঘাতক হিমশৈলটির একটি ঐতিহাসিক ছবি বর্তমানে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আমেরিকান হিস্ট্রিতে সংরক্ষিত রয়েছে, যা দুর্ঘটনার পর কার্পেথিয়ার যাত্রী বার্নিস পামারের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, টাইটানিকের এই ট্র্যাজেডি এড়ানো অসম্ভব কিছু ছিল না। টাইটানিক যদি মাত্র এক ঘণ্টা পরে সেই স্থানে পৌঁছাত অথবা হিমশৈলটি যদি সামান্য দূরত্বে অবস্থান করত, তবে হয়তো সাগরের বুকে এই বিয়োগান্তক অধ্যায় রচিত হতো না। প্রকৃতির দীর্ঘ তিন বছরের পথচলা আর মানুষের তৈরি শ্রেষ্ঠ জাহাজের কয়েক দিনের যাত্রার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মিলনস্থল আজ অবধি বিশ্ববাসীকে শোকাতুর করে রাখে।