
আধুনিক জীবনযাত্রায় স্মার্টফোন আমাদের নিত্যদিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে ছবি তোলা, স্মৃতিময় মুহূর্ত ভিডিও করে রাখা কিংবা প্রিয়জনদের সাথে নিয়মিত ভিডিও কলে যোগাযোগ করা এখন খুবই সাধারণ বিষয়। তবে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদই অনায়াসে অভিশাপে পরিণত হতে পারে, যদি আপনার অজান্তেই ফোনের ক্যামেরাটি চলে যায় অন্য কারও নিয়ন্ত্রণে। বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধীরা ব্যবহারকারীদের স্মার্টফোনের ক্যামেরা হ্যাক করে দূর থেকে গোপনে নজরদারি চালানোর এক ভয়াবহ জাল বিস্তার করেছে। একবার কোনো কৌশলে ফোনের ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে, ব্যবহারকারীর সম্পূর্ণ অলক্ষ্যে ঘরের ভেতরের একান্ত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে পারে এই চক্র। ইন্টারনেটের মাধ্যমে এসব ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেল, ব্ল্যাক মার্কেটিং, পরিচয় চুরি (আইডেন্টিটি থেফট) কিংবা নানা ধরনের সামাজিক ও আর্থিক অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে সাইবার অপরাধীরা, যা সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে এক চরম ও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোনে কোনো ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা স্পাইওয়্যার প্রবেশ করানোর মাধ্যমেই মূলত এই অদৃশ্য নজরদারির ঝুঁকি তৈরি করা হয়।
সাইবার অপরাধের এই অন্ধকার দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হ্যাকাররা সরাসরি কোনো জাদুমন্ত্রে ফোনের ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করে না; বরং এর পেছনে থাকে সুপরিকল্পিত প্রযুক্তিগত জালিয়াতি। ব্যবহারকারীর ফোনে ম্যালওয়্যার বা স্পাইওয়্যার নামক এক ধরনের ক্ষতিকর প্রোগ্রাম গোপনে প্রবেশ করিয়ে দূর থেকেই সম্পূর্ণ ক্যামেরার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেয় অপরাধীরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেসব বৈধ বা আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হওয়া অ্যাপকে ব্যবহারকারীরা নিজ দায়িত্বে ক্যামেরা ব্যবহারের অনুমতি (পারমিশন) দিয়ে থাকেন, সেগুলোর দুর্বলতাকে পুঁজি করেই এই হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় ইন্টারনেট থেকে কোনো থার্ড পার্টি বা অনিরাপদ অ্যাপ ইনস্টল করার সময় ব্যবহারকারীরা অসাবধানতাবশত শর্তাবলীতে চোখ না বুলেই ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে দেন। এই সুযোগে সেই ক্ষতিকর অ্যাপটি ব্যাকগ্রাউন্ডে বা ফোনের পর্দার আড়ালে গোপনে ক্যামেরা সচল রাখে এবং ক্রমাগত ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে হ্যাকারদের সার্ভারে পাঠাতে থাকে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে যে, ফোনের ক্যামেরা দিয়ে কি দূর থেকে সরাসরি বা রিল্যায়েন্ট নজরদারি সম্ভব কি না। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে এটি অবশ্যই সম্ভব, তবে তা তখনই ঘটে যখন ফোনে থাকা ম্যালওয়্যারটি ব্যবহারকারীর অজ্ঞতার কারণে ক্যামেরা ব্যবহারের চূড়ান্ত অনুমতি পেয়ে যায়। কোনো ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল পারমিশন ছাড়া দূর থেকে হুট করে ফোনের ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করা কোনো হ্যাকারের পক্ষেই সম্ভব নয়।
আপনার পকেটে বা ঘরে থাকা ফোনটির ক্যামেরা গোপনে অন হয়ে আপনাকে দেখছে কি না, তা বোঝার জন্য ফোনে কিছু সুনির্দিষ্ট অস্বাভাবিক আচরণ বা লক্ষণ প্রকাশ পায়। যদিও অনেক সময় ফোনের নিজস্ব সফটওয়্যার বা অপারেটিং সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ ত্রুটির (বাগ) কারণেও কিছু সমস্যা হতে পারে, তবে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ যদি বারবার ও নিয়মিত দেখা যায়, তবে ধরে নিতে হবে আপনার ফোনটি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে। যেমন—ফোনটি অলস ফেলে রাখা হয়েছে বা আপনি কোনো ব্যবহার করছেন না, অথচ হঠাৎ করেই ক্যামেরার পাশে থাকা নির্দেশক আলো বা গ্রিন ডট ইন্ডিকেটরটি জ্বলে উঠছে। এছাড়া ফোনের মূল ক্যামেরা অ্যাপটি যদি আপনার স্পর্শ ছাড়াই নিজে নিজে বারবার চালু বা বন্ধ হতে থাকে, কিংবা হঠাৎ করে ফোনের গ্যালারি চেক করতে গিয়ে যদি এমন কিছু অচেনা ছবি বা ভিডিওর সন্ধান পান যা আপনি কখনোই তোলেননি, তবে তা অত্যন্ত বিপদের লক্ষণ। এর পাশাপাশি ফোনে কোনো ভারী কাজ না করার পরেও যদি হ্যান্ডসেটটি অস্বাভাবিক মাত্রায় গরম হয়ে ওঠে, ব্যাটারির চার্জ দ্রুত বা চোখের পলকে শেষ হয়ে যায় এবং আপনার দৈনিক ইন্টারনেট ডেটা বা এমবির ব্যবহার যদি কোনো কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তবে বুঝতে হবে ব্যাকগ্রাউন্ডে গোপনে ডেটা পাচারের কাজ চলছে। এই লক্ষণগুলো দেখা মাত্রই ফোনের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সন্দেহভাজন অ্যাপগুলো মুছে ফেলা এবং ফোনটি ফ্যাক্টরি রিসেট করার মতো সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।